শত্রু অভিন্ন, লড়াইটাও

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২০, ২১:৫২

করোনা ভাইরাসের উপসর্গ যাদের আছে বা যারা আক্রান্ত—তাদের সঙ্গে সহানুভূতিপূর্ণ সব ধরনের পরিচর্যা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বব্যাপী বহু আক্রান্ত মানুষ ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আরো উঠবেন। স্ববিবেচনা ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানই এই যুদ্ধের বড়ো হাতিয়ার। বিশ্বের অন্যত্র সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের এক্সপার্টরাই নিয়মিত ব্রিফ করছেন। ফ্ল্যাগশিপ পলিসি এবং মোটিভেশনাল ঘোষণাগুলো দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিগণ। সুনির্বাচিত শব্দের যথাপ্রয়োগ করছেন। পার্লামেন্টকে প্রথমেই অবহিত করছেন, জবাবদিহি ও করছেন। অত্যন্ত জরুরি ও জনকল্যাণমূলক ইনসেনটিভ প্যাকেজ পার্লামেন্টের পূর্বেই প্রেসকে বলার কারণে স্পিকারের তিরস্কারের অপেক্ষা না করেই ক্ষমা চেয়েছেন ব্রিটিশ চ্যান্সেলর ঋষি সুনাক। বাংলাদেশেও দয়া করে বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করুন। সংযত, প্রয়োজনীয় শব্দের বাইরে আর কিছু না বলুন। সরকারি দপ্তরগুলো সাংঘর্ষিক, অস্পষ্ট সার্কুলার বা ঘোষণা দানে বিরত থাকুন।

ইউরোপে কোভিড-১৯ বিপর্যয় এবং তাদের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে। ইউরোপে আতঙ্ক এবং বিপর্যয়টা দেখছি খুব সামনে থেকে। মার্চের দুই তারিখে ইন্দোনেশিয়ার তরুণ আইনজীবী জিমি আমার সঙ্গেই ফিরছিলেন সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে। সেন্ট্রাল লাইনের যাত্রী আমরা দুজনেই। তার আগের দিন অক্সফোর্ড স্ট্রিট এই ঘটে গেছে সিঙ্গাপুরের ইউসিএল-এর ছাত্রের ওপর আক্রমণ। আক্রমণের কারণ কোবিড-১৯। তখনো এই রোগ এশিয়ান রোগ বিশেষত চাইনিজ রোগ নামে পরিচিত। চেহারায় পূর্ব এশিয়ানরা প্রায় একই রকম (মোঙ্গলয়েড) দেখতে হওয়ায় সিঙ্গাপুরের ছাত্রটি আক্রমণের শিকার হয়। ইন্দোনেশিয়ার তরুণটিকে পূর্ব-লন্ডন পর্যন্ত সঙ্গ দিয়ে বিদায় নিয়েছিলাম। এই ২০ দিনে অবশ্য ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। করোনা ভাইরাস রীতিমতো শ্বেতাঙ্গ চেহারার মানুষগুলোর ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে করোনার আঁতুড়ঘর চীন এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ। ইতালিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে চীনের আলিবাবার জ্যাক মা-সহ বহু কোম্পানি এবং সরকার ডব্লিউএইচওকে সহায়তা করছে। এখন আর লন্ডনের রাস্তাঘাট পূর্ব এশিয়ান চেহারার জন্য অনিরাপদ নয়।

সংকটের গোড়ার দিকে লন্ডনে টয়লেট পেপার পাওয়া যাচ্ছিল না। হ্যান্ড ওয়াসারসহ স্যানিটাইজারের অভাব দেখা গিয়েছিল। প্যানিক পারচেজ শব্দটা চালু হয়ে গিয়েছিল। একটা শপিং স্টোর-এ দেখলাম খুবই বিরক্ত হয়ে তারা একটা সাইন-এ লিখেছে: This nation is currently experiencing shortage of toilet roll and lacking common sense. জানা গেল, ব্রিটিশ ব্যবহারকারীদের ব্যাক প্যাসেজ পরিষ্কার রাখার বেশির ভাগ সাপ্লাই আসে বাইরের দেশ থেকে। চীন এক্ষেত্রে বড়ো অংশীদার। রেশনিংয়ের কারণে প্যানিক পারচেজ কিছুটা কমেছে। হালাল পণ্যের শপগুলো অবশ্য এক কাঠি সরেস। সংকটের শুরুতে এরা (এশিয়ান দোকান মালিক এবং সাপ্লাইয়ার) মওকা বুঝে দাম বাড়াচ্ছিলেন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বোধহয় এদের বিশেষ গুরু বা মুরিদ হবেন (ভাইস ভার্সা)। লোকাল গভর্নমেন্টের ধমক খেয়ে এখন কিছুটা বিবেকে ফিরেছেন। এর বাইরে অন্য কোথাও বিন্দুমাত্র মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে বরং অফার মূল্য আগের মতোই রয়ে গেছে। এশিয়ান এক সাধারণ দোকানি দম্পতি ৬০ বছরের ওপরের বয়সি সব কাস্টমারকে স্বাস্থ্যসামগ্রী বিনামূল্যে দিয়েছেন। কোনো কোনো বয়োবৃদ্ধ মানুষকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা রাউন্ড দ্য ক্লক কাজ করছেন। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নমনীয় ভাবে রোগীদের সামলাচ্ছেন। ব্রিটেনের এনএইচএস নতুন করে ৩০ হাজার বেড জোগাড়ের চেষ্টা করছে। যেহেতু ব্রিটিশ ইকোনোমি মূলত সাপ্লাই নির্ভর, সেকারণে চ্যালেঞ্জটাও উত্পাদন অর্থনীতির দ্বিগুণ। স্পেন, ইতালি, সাইপ্রাসের সবজি, কোস্টারিকার কলা, ভারত পাকিস্তানের আম, বাসমতী চাল ব্রিটিশ সুপার মার্কেটের বড়ো ভরসা। তবে বেশ কয়েক ধরনের স্বাস্থ্যসামগ্রী ব্রিটেনেই তৈরি এবং সংকটের সময় উত্পাদন দ্বিগুণ করা হচ্ছে। মানুষ এখন সেলফ রেস্ট্রেইন্ট অ্যাপ্লাই করছে। বার, পাব, রেস্তোরাঁ, জিম, সিনেমাসহ যে কোনো জনসমাগমের জায়গাগুলো বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধের ঘোষণা এসেছে। ১৯ মার্চ পর্যন্ত এগুলো ছিল অ্যাডভাইসরি নির্দেশনা। কিন্তু কিছু মানুষ যেন কিছুতেই কিছুদিন আলাদা থাকবেন না! ফলে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আচরণগত দিক থেকে ব্রিটিশ ও বাঙালি প্রায় একই রকম।

শত্রু সর্বত্র, অদৃশ্য; কিন্তু আক্রমণ সর্বব্যাপী। প্রাথমিক হতভম্ব ভাব কেটে গিয়ে মানুষ প্রতিরোধে নেমেছে। সেবার লড়াইয়ের প্রেরণা ছড়িয়ে পড়ছে। স্বেচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সেবা শুরু হয়েছে। উহানের দুর্যোগের সময় চীনের অন্য এলাকা থেকে হাজার তরুণ স্বেচ্ছায় উহানে এসেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্যদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইতালির ভয়াল দুর্যোগে নিপতিত মানুষেরা ব্যালকনি থেকে গিটারের মূর্ছনায় অন্যদের বলছেন—পাশে আছি, সাথে আছি। ‘একসাথে বাঁচি, উচ্চ শিরে বাঁচি’—যেন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে, দেখাচ্ছে আশার আলো। হলিউড তারকারা বলছেন, ‘এভরি ওয়ান অব আস হ্যাভ সাম ওয়ান’ লেটস ফাইট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব জানাচ্ছেন তার মেয়ে বাসায় থেকে অনলাইন ক্লাস করছে। তিনি অন্য তরুণদের বলছেন এই ভাইরাস তাদেরও মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, শুধু বয়স্করা বিপদাপন্ন—সেই ধারণা ভুল। ৫০-এর নিচের আক্রান্তের সংখ্যা বিরাট। যারা বাসায় থাকবেন তাদেরকে কমপক্ষে ত্রিশ মিনিট দৈনিক হালকা ব্যায়াম, ইয়োগা করতে বলেছেন। এদিকে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান রাজনৈতিক ভিন্নতা এক পাশে সরিয়ে রেখেছে। চীন বিরাট চালান পাঠিয়েছে কোরিয়ায়। জাপান অবশ্য শুরু থেকেই ভালো অবস্থায় আছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন—‘আমরা যুদ্ধে পতিত হয়েছি।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেনে নিয়েছেন সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানকে পাশে পেতে হবে। ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতি অবশ্য তিনি ছাড়েননি এখনো। বিশ্বজুড়ে বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য, বিদ্বেষ, ঘৃণা ছড়ানোর তত্পরতা অবশ্য বন্ধ হয়নি। কল্পিত রোগীর মারা যাওয়ার ভুয়া খবর ছড়িয়ে বাংলাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। অপর দিকে সোশ্যাল দূরত্ব তৈরির মাধ্যমে লড়াইটা জারি রাখার জন্য বিশ্বের দেশসমূহ কাজ করছে।

মানবজাতির অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখনো পর্যন্ত সর্বোত্তম সমাধান হিসেবে সবাই একমত হয়েছেন। বাংলাদেশে এই সুযোগে বাসা, আশপাশ, দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানের কার্নিশে ওপর থেকে ফেলা ময়লা পরিষ্কারের কাজ শুরু করা যেতে পারে। গেল বারের ডেঙ্গুর ভয় সবাইকে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন করতে পারলে আগুয়ান ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা অনেক এগিয়ে আনা যাবে। সবাই সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। কিছু সময়ের জন্য হলেও শুধু মানুষ পরিচিতি সামনে আনুন। সরকার মুজিববর্ষের ফ্লাগশিপ ইভেন্ট পিছিয়ে প্রশংসাযোগ্য কাজ করেছেন। প্রশংসার লাভের গুড় যেন পিঁপড়া খেয়ে না ফেলে। সচেতন, সতর্ক থাকি। ভয় না পাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি না করতে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও বলেছেন: defeating the enemy is difficult but not impossible. We know how to defeat. যেন চার্চিল এর পুনরুক্তি: we shall never surrender. মিলে যায় বঙ্গবন্ধুর অমিত বিক্রম উচ্চারণের সঙ্গে—‘বাঙালি কখনো হার মানবে না।’

নিম্ন আয়ের মানুষদের দুই সপ্তাহের সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক, করপোরেট ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা এখনই নেওয়া হোক। শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য স্ব স্ব থাকার জায়গায় দুই বেলা খাবার পৌঁছে দেওয়া হোক। ন্যূনতম একটা ক্যাশ অন্তত পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। কাজটি করতে হবে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে, পক্ষপাতহীনভাবে। সরকারের পাশাপাশি সক্ষম ব্যক্তি, পরিবার, বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসুক। ব্যাংকগুলোকে সরকারি তহবিল দেওয়া হোক যাতে তারা ছয় মাস বিনা সুদে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ে আপত্কালীন ঋণ দিতে পারে। প্রতিষ্ঠান এই তহবিল কর্মীপর্যায়ে আপত্কালীন সহায়তার জন্য ব্যবহার করতে পারে। বস্ত্র খাতের কর্মীদের জন্য বিশেষ সহায়তা জরুরি। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এই সমস্যাকে স্বাস্থ্য দুর্যোগের পাশাপাশি আর্থিক জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। সবাই সবার পাশে আছে এই বোধটা ছড়িয়ে দিতে পারলে সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

সময় এখন সেবা, পরিচর্যা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে যুদ্ধজয়ের। বিশ্বজুড়ে মানব মাত্রেরই অভিন্ন আবেদন—‘সচেতন, সতর্ক থাকি, ভয় না পাই, স্বার্থপর না হই।’ ২০২০ সালে বাংলাদেশে এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালির কাছে মুজিববর্ষের আবেগ উচ্চতম মর্যাদায় অভিষিক্ত। কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক সংক্রমণ মুজিববর্ষের চ্যালেঞ্জকে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে এই চ্যালেঞ্জকে বিপুল সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার। বঙ্গবন্ধুর অমিত বিক্রম সাহসকে মানবিক আবেদনে রূপ দেই। জয় হোক বাংলার, জয় হোক প্রস্তর যুগ থেকে লড়াইয়ে থাকা মানুষের। অপ্রয়োজনীয় কথা বন্ধ হোক। প্রয়োজনীয় কাজ জারি থাকুক। সময় এখন নিজের এবং অন্যের যত্ন নেওয়ার। সময় এখন স্ব বিবেচনায় সুবিবেচনার। (লন্ডন থেকে)

n লেখক : গবেষক, আইনজীবী