রক্তাক্ত রাতের ইতিকথা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২০, ২১:৫৩

 ‘মুজিব জন্মশতবর্ষে’ এসে আবারও আমরা স্মরণ করছি ভয়াল রাতের কথা। একাত্তরের ২৫ মার্চ ‘ভয়াল রাত’ হিসেবে গণ্য; গণ্য পাকিস্তানিদের গণহত্যার সূচনা হিসেবে; যদিও তাদের হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা-আন্দোলন থেকে তারা বাঙালিদের নিধনযজ্ঞ শুরু করে তারপর বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে-শহরে ঘটেছে অনেক ঘটনা আর সেসব ঘটনায় নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছেন অজস্র বাঙালি। এই যে বাঙালিদের ওপর তাদের আক্রোশ ২৩ বছর ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছে তারই ভয়ঙ্কর রূপটি দেখা গেছে ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে। কারণ, পাকিস্তানিদের বাঙালি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। পাকিস্তানিরা তাদের মতো সমমর্যাদার মানুষ মনে করেনি বাঙালিদের, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন জনের মন্তব্যে। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল হোতা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী তার স্মৃতিকথায় বাঙালিদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, বাঙালি তিন রকমের। ‘বাবু বাঙালি’রা লেখাপড়া শিখে কেরানি হতে আগ্রহী, ‘জাদু বাঙালি’রা ডাকিনী আর ‘ভুখা বাঙালি’ তো চির ক্ষুধার্ত।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির বাঙালি সম্পর্কে ধারণা ছিল একই রকমের। ‘বাঙালিরা হলো নিচু এলাকার মানুষ, শয্যার নিচে শায়িত হওয়াটা তাদের অভ্যাস।’ ভারতবর্ষের হাজার বছরের ঐতিহ্য লালনকারী একটি জাতি সম্পর্কে পাকিস্তানি সেনাদের এ ধরনের মনোবৃত্তি একাত্তরে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। লেলিয়ে দেয়া হয় সেনাবাহিনীকে বাঙালি জাতিকে নিঃশেষ করার জন্য। চালানো হয় নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ। আজও আবিষ্কৃত হচ্ছে অনেক বধ্যভূমি যা পাকিস্তানিদের গণহত্যা বা জেনোসাইডের সাক্ষ্য বহন করছে।

একাত্তরে ৩০ লাখ ১০ হাজার বাঙালি নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল গণহত্যা। গণহত্যা হলো বিকৃত মানসিকতার পরিচয় যার সঙ্গে নৃশংসতা শব্দটি জড়িত। এটি হলো একটি গোষ্ঠীকে লেলিয়ে দেওয়া অন্য একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে; আক্রান্ত গোষ্ঠী নিরীহ ও নির্বিবাদী। পাকিস্তানি আমলে বাঙালি জাতিগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর কোনো রকম পীড়ন কিংবা হামলা চালায়নি। তবু এ হত্যালীলায় উল্লাসে মেতে উঠেছিল পাকিরা। কিন্তু কেন? কারণ তারা জানত ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বেশে বাঙালির সেই পরিচয় বিশ্ববাসী দেখেছিল। ২৫ মার্চের গণহত্যার সূচনা যে পাকিস্তানিদের পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিল তা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।

২৫ মার্চ রাতের ঘটনা এখনো বিশ্বের ইতিহাসে হূদয়বিদারক হিসেবে চিহ্নিত। সেদিন রাজারবাগের পুলিশ বাহিনী ও পিলখানার পূর্বপাকিস্তান রাইফেলসকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। ত্রাস সৃষ্টির জন্য অনেক এলাকায় গোপন স্থান থেকে গুলি ছোড়া হয় এবং বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের জন্য বাসায় বাসায় হামলা চালানো হয়। প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি যে যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন এবং হাতে যার যা আছে তা-ই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান যতদিন না দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে।’ বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার আগেই বাঙালিদের প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। 

বিভীষিকাময় রাতের ঘটনায় যদিও আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে হানাদাররা ঘুমন্ত নগরবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু একেবারে সহজ ছিল না সেই অপারেশন সার্চ লাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হানাদাররা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। তত্কালীন ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের অনেক ছাত্র সেই প্রচণ্ড হামলার মধ্যেও প্রতিরোধ গড়ে দেশমাতৃকার জন্য শহিদ হন। রাতের আঁধারের সেই হূদয়বিদারক ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন অনেকেই। চতুর্দিকে অগ্নিশিখা ধূম্রকুণ্ডলী সৃজন করে ব্যাপ্ত ছিল সেই রাত। আর মানুষের আর্তনাদ ছিল আকাশস্পর্শী মর্মদাহিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণকবরগুলো আজো সে রাতের ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। হামলার ফলে অনেক ভবনই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। ঢাকা নগরের রাজপথে ছিল মৃতদেহের স্তূপ।

২৬ মার্চ সকালে ভুট্টো বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে বলে গিয়েছিলেন ‘আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ, পাকিস্তানকে রক্ষা করা গেছে।’ আর সেনা সদস্যরা বলেছিল, ‘বাঙালিদের ভালো করে এবং ঠিকমতো বাছাই করা হয়েছে...অন্তত একটি বংশধরের জন্য তো বটেই।’ কিন্তু পাকি-হায়েনারা অবাক দৃষ্টিতে দেখেছিল বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। একইভাবে একাত্তরের গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী এদেশীয় রাজাকার, আল-শামস, আল-বদরবাহিনী বর্তমানে যুদ্ধপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হয়ে উপলব্ধি করছে বাঙালি জাতি নিধনের সেই কলঙ্ক তিলক কতটুকু যাতনার। তবে নীরব গণকবরগুলো কালের সাক্ষী; যে কাল কেবল ধ্বংসের কথা বলে না; প্রতিরোধের প্রবল স্পৃহার কথাও জানান দেয়।

n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়