সাতাশ মার্চ রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের দখল নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। আর সেদিনই জান নিয়ে কোনো রকমে বেতার কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাই। আমি পহেলা মে কলকাতায় পৌঁছে আশ্রয় পেলাম দৈনিক ইত্তেফাকের শিফট-ইন-চার্জ মাহমুদুল্লাহ চৌধুরীর কাছে। তাঁর মাথায় তখন খেলছে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের ভাবনাচিন্তা। আমাকে নিয়ে তাঁর আশা প্রগাঢ় হলো। তার দু’দিন পর এমএনএ ইনচার্জ টাঙ্গাইলের আবদুল মান্নানের কাছে পরিকল্পনা সবিস্তারে পেশ করা হলো। অতঃপর ১৭ মে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ আলোর মুখ দেখল। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দুই বাংলাতেই জনপ্রিয় সাংবাদিক। দৈনিক আনন্দবাজারের মালিক-কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর ওঠা-বসা। তিনি খুব বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। আনন্দবাজার থেকে ফ্রি নিউজ প্রিন্ট ও প্রেসে ছাপানোর একটি ব্যবস্থা করে ফেলেন। কলেজ স্ট্রিট থেকে কাগজ ও প্রেসের সব আয়োজন করে পেপার বের করা খুব ঝকমারি ব্যাপার।
সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’-র মাস্তুল অঙ্কন করেন প্রখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান। অফিসে দুজন খ্যাতনামা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল মান্নান এমএনএ ও ভৈরবের এমএনএ জিল্লুর রহমান নিয়মিত বসতেন। সম্পাদকমণ্ডলী গঠন করা হয়। সভাপতি হলেন এমএনএ-ইনচার্জ আবদুল মান্নান। সদস্য আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিক, ড. এবনে সামাদ, আসাদ চৌধুরী, মঞ্জুর আহমেদ, অনু ইসলাম, সলিমুল্লাহ প্রমুখ। পারিবারিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আবদুুল মান্নান এমএনএ পত্রিকার প্রিন্টার্স লাইনে আহমদ রফিক ছদ্মনাম ব্যবহার করেন এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মাহমুদুল্লাহ চৌধুরী, যিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করেন মতিন আহমদ চৌধুরী। প্রেসের নাম দেওয়া হয় ‘ জয় বাংলা প্রেস’। জয় বাংলা প্রবাসী সরকারের ১ নং রেজিস্ট্রার্ডভুক্ত এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র। প্রবাসী সরকারের মুক্তিযুদ্ধের কর্ম পরিকল্পনার কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়তে থাকে। বিবিসি, ভোয়া ও আকাশবাণী তাদের সংবাদ ও সংবাদ পর্যালোচনায় জয় বাংলার রেফারেন্স টানতেন। এই সাপ্তাহিকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিভিন্ন সময়ের ভাষণ, রণাঙ্গনের খবর, সম্পাদকীয়, সাহিত্য পৃষ্ঠায় গল্প-কবিতা, আকর্ষণীয় কার্টুন প্রকাশ পেত। শিল্পী কামরুল হাসানের বিশ্ববিখ্যাত সেই কার্টুন ‘এই জানোয়ারটাকে হত্যা করতে হবে’ জয় বাংলাতেই প্রকাশিত হয়—ইয়াহিয়া খানের মুখাবয়বে ফুটে ওঠে নিষ্ঠুর হিংস্র দানব। কামরুল ভাই জয় বাংলার অফিসে বসে প্রতিদিন বলপেন্সিলে একটানা কার্টুন আঁকতেন। স্বাক্ষর করতেন ‘সাতুন’।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই হয় একদিকে যেমন রণাঙ্গনে সশস্ত্র সমর কৌশলে, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, সংবাদপত্র বিশেষ করে সাপ্তাহিক জয় বাংলা, কূটনৈতিক মিশনে। জয় বাংলার পাতায় পাতায় তার চিত্র ফুটে উঠত।
বিজয়ের একেবারে দোরগোড়ায় জয় বাংলা ৩১তম সংখ্যায়, ১০ ডিসেম্বর শীর্ষ সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকার মুক্তি যে কোন মুহূর্তে’, যশোর ও কুমিল্লার পর খুলনা ও চাঁদপুর মুক্ত। বঙ্গবন্ধুকে চাই। কামরুল হাসানের বিখ্যাত সেই কার্টুনের ক্যাপশন বদলে লেখা হলো ‘এই জানোয়ারটা বিদায় হয়েছে’।
