অপ্রকাশিত

অরুণ মিত্র আলো-আঁধারির তামাশা, তাঁর অবলোকনে

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৫৪

কবি অরুণ মিত্র-র একটি কবিতা— এর শুরুতেই তিনি বলছেন— হয়তো তাঁর ভেতর-দরোজা খোলার চাবিটি আছে এ কবিতায়— তাঁর অভ্যেসের গদ্যবিন্যাসে ভাবছন্দে লেখা কবিতাটির প্রথম পুরো বাক্যটি এই : 

‘আলো-আঁধারির তামাশা আমাকে জাগিয়ে রেখেছে এতকাল     ওঃ    এ কী চোখ টেনে দেখা,     লম্বা সরবন হঠাত্ বিজিল ছুটিয়ে কাঁপে      সরে যায়      আমি ঠাওর করতে গেলে ঠাসা ছায়া আবার।’

জীবন আমাদের রণিত করে— কাউকে কাউকে এমত যে তাঁদের কাছে ভাষাশব্দে কবিতা আসে তারই অনুরণন হয়ে। কবিতা আসে কিংবা শূন্য থেকে শরীরে তাকে গঠন করা হয় রক্তজল মেধাবী শ্রমে— একটু একটু করে, ইন্দ্রজালটি যা-ই হোক, কবিতাকে কবিতা বলে পাঠকের চিনে উঠবার, এবং ভেতরে নেবার একটিই ছক— যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা ও দূরকল্পনার সঙ্গে উচ্চারণগুলো মিলিয়ে দেখা; এভাবেই কবিতাকে আমাদের বুঝে উঠতে হয়— আর, এটাই হচ্ছে একজন কবিকে গ্রহণ করবার একমাত্র উপায়, না-করবারও।

এভাবেই অরুণ মিত্রকে আমি পড়েছি; তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেছি এবং আমার মনে হয়েছে আমাদের চারপাশের যে বাস্তবতা— দৃষ্টিগ্রাহ্য জগতের ও মানস-ভুবনের— সেই যুগল বাস্তবতার ভেতরে তিনি আবিষ্কার করেন এক ধরনের আলো-আঁধারি, আর এই আলো-আঁধারিই তাঁকে বিরতিহীন আলোড়িত করে— আলো-আঁধারির ভেতরে যে তামাশা তিনি অবলোকন করেন, সেটাই বিশেষ করে তোলে তাঁর জীবন এবং কবিতাকে, কবিতা এবং তাঁর বোধ-সমাগমটিকে। আলো-আঁধারির তামাশাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কবিতা— বিশেষ করে তাঁর জীবনের শেষ বছর পঁচিশ; এবং সেই তামাশাটি স্মরণীয় বাক্প্রতিমায় ধরে রাখবার প্রতিভা তাঁর ছিলো বলেই তিনি আমাদের কাছে, তাঁর প্রয়াণের পরেও— প্রার্থনীয় এবং পঠনীয়।

ভুলে যাবো না যে, সব কবিই তাঁর আয়ুর ঊর্ধ্বে উড্ডীন আর থাকেন না— অধিকাংশ তাঁরা প্রয়াত হন কবি ও ব্যক্তি, দুই অর্থেই। কিন্তু এতে গৌরবহানি নেই, শিল্পে দেয়া তাঁদের শ্রমটাও মূল্যহীন নয়। যতদিন মর্ত্যে আছি, কবিতায় সংবাদ পৌঁছে দিয়ে চলেছি; একদিন চলে যাচ্ছি এবং সেই সংবাদ বহনের ভার আরেকজন এসে নিচ্ছেন— এটা বিষাদজনক কোনো পরিণতি নয়। প্রতিদিনের ভেতরে উপস্থিতি, সে কী কম! বা, সহজসাধ্য! যাপিত জীবনে খাদ্যের মতোই অধিকাংশ কবি আমাদের স্বাস্থ্য জোগান, জুগিয়ে চলেন— যতদিন সংসারে আছেন। এই গার্হস্থ্য দায়টি পালন করাও সকলের ভাগ্যে হয়ে ওঠে না। এঁদের বিপরীতে কোনো কোনো কবি আছেন— সংখ্যায় তাঁরা সামান্যই— দেহপতনের পরেও তাঁরা থেকে যান, আয়ুসীমিত কালের শেষ নিঃশ্বাস পরেও তাঁরা অপার্থিব নিঃশ্বাস নিয়ে চলেন আমাদের ভেতরে, উড্ডীন তাঁরা পাখির মতো, জন্ম তাঁদের আগুনপাখি প্রায়, মরেও যার মৃত্যু নেই, আমাদের বোধির আকাশে এই সকল কবির পাখার শব্দ ধ্বনিত হয়েই চলে। আমি অরুণ মিত্রকে তেমন একজন কবি বলেই জেনে উঠেছি। তাঁর জন্ম শতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে তাঁকে আমি অগ্রজের প্রাপ্য বিনয়-শ্রদ্ধা নিবেদন করছি— আমি আমার পক্ষ থেকে, বাংলাদেশের সকল কবির পক্ষ থেকেও। আর এই শ্রদ্ধা নিবেদনের অবকাশটি আমাকে দেবার জন্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছি ‘কবিতা প্রতিমাসে’ এবং এর সম্পাদক শ্রী বীজেশ সাহাকে। জন্মশতবার্ষিকীতে কবি অরুণ মিত্র স্মারক বক্তৃতা দেবার জন্যে বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, আতিথেয়তা দিয়ে, তাঁর প্রতি আমার পূর্বতন প্রীতিকে তিনি গাঢ় করেছেন। 

জন্মশতবার্ষিকী; বর্ষকাল ভেতরেই আমরা সাহিত্যস্রষ্টা তিন অধিপের জন্মশতবার্ষিকী ছুঁয়ে এসেছি— বুদ্ধদেব বসু, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিষ্ণু দে-র। এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি তাঁদের আরো একবার স্মরণ করছি; আমার নির্মাণে এঁদেরও হাত ও মাটি লেগে আছে। বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর উদ্দেশে প্রণাম পাঠাচ্ছি, যাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের পরেই আমি ঋণী— কবিতায় তিনি আমাকে পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দেন, আশ্বাস দেন যে কিছু একটা হচ্ছে, আর গদ্যে তিনি আমার ওপর রৌদ্র বিস্তার করে রাখেন, যদিও মতামতের বহুক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে ভিন্নতাও আমি ধরেছি।

বুদ্ধদেব বসুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমার একটি লেখায়— যা কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিলো— বলেছিলাম, উনিশশ’ সাতচল্লিশ উত্তর পূর্ববাংলায় আমরা সাহিত্যের পাঠ নিয়েছি একলব্যের মতো— এক অরণ্যে, মধ্যযুগীয় এক মানসমণ্ডলে জন্ম নেয়া আমরা, দূর থেকেই মনোধ্যানে নিবিষ্ট থেকে। কঠোর সীমান্তের ওপারে স্থিত কলকাতার সাহিত্য-পরিবেশে আমাদের যাবার জো ছিলো না, সমসময়ে কী লেখা হচ্ছে, ভাবনার কোন্্ তরঙ্গ মেধাবী নদীতে উঠছে, নদীটিই বা কোন্্ পথে বাঁক নিচ্ছে, তারও প্রত্যক্ষ সংবাদ পাবার উপায় ছিলো না। এর ভেতরে থেকেই আমাদের চিনে নিতে হচ্ছে আমাদের সংসার, বুঝে নিতে হচ্ছে নিসর্গ, আয়ত্ত করতে হচ্ছে উড্ডীন হবার শক্তি।

সেটা গত শতাব্দী— ভাবতেও অবাক লাগে এরই মধ্যে সে শতাব্দীটিকে গত বলছি— সেই বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের একেবারে শেষ দু’তিনটি বছর আর পঞ্চাশের একেবারে শুরুতে আমরা ক’জনা লেখায় এসেছিলাম।

এঁদের মাত্রই দু’তিনজনার নাম বা কাজ এখানে, পশ্চিমবঙ্গে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক চর্চার কারণেই অধিক, কিছুটা পরিচিত— কিন্তু এঁদের বাইরেও যে কেউ কেউ আছেন বা অনেকেই, সে সংবাদ যে এখানে পৌঁছোয়নি, এখনো যে পৌঁছোচ্ছে না— এটা পদ্মার ওপারে আমাদের যতটা না ক্ষতি, তার অধিক পদ্মার এপারে এখানকার ক্ষতি বলেই আমি মনে করি; কারণ, বাংলা ভাষাতে আমরা দু’দেশেই লিখছি কিন্তু আমাদের দু’য়ের বাস্তবিক পরিচয়টা ঠিক ঘটে ওঠেনি; পরিচয়ের ভূভাগ যতটা আমাদের মধ্যে বিস্তৃত, সে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের সহযাত্রীদের একেবারেই সীমিত ও একপেশে, এবং প্রায়শ তা ভ্রান্ত বলেও আমি দেখতে পাই।

আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের সেই সময়টার কথা বলি। বাঙালি মুসলমানের মানসিক একটা পটভূমিতে আমরা আমাদের জন্ম দেখে উঠি। সেটা হচ্ছে— সংক্ষেপে এই— সৈয়দ আলাওলদের কাল পরে, বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচর্চা দেয়ালঘেরা হয়ে ওঠে— দোভাষী পুঁথি বা মুলমানি সাহিত্য নামে একটা আলাদা সংসার গড়ে তোলার প্রবণতা দিনে দিনে বাড়তেই থাকে; এরই ভেতর থেকে অকস্মাত্ ব্যতিক্রমী কলমও দেখা যায়— সেটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না বা পড়েনি— একজন মীর মোশাররফ হোসেন বা কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা জসীমউদ্দীন দেয়াল ভেঙে বাংলাসাহিত্যের মূল ভূখণ্ডে বাসা গড়েন। সেটা যে কতখানি ব্যতিক্রমী ঘটনা তা বোঝার জন্যে স্মরণ করা যেতে পারে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমালোচনা— মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু সম্পর্কে— যে, মুসলমানে যে এরূপ বাংলা লিখতে পারে ইতিপূর্বে তা তাঁর জানা ছিলো না!

এই মহান ব্যতিক্রম সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমান কিন্তু সাহিত্যে কলম ধরে চলেছে মুসলমানী দেয়ালঘেরা মণ্ডলেই— একনাগাড়ে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ওই দশক-সময়েই আবু রুশদ বা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্, আবুল হোসেন, আহসান হাবীব কিংবা এমনকি ফররুখ আহমদ এসে গেলেও, তখনকার বাঙালি মুসলমান সাহিত্য যশোপ্রার্থীরা সবাই যেন আলাদা একটা সাহিত্য, আলাদা একটি সাহিত্যিক ধারা রচনাতেই উত্সাহী হয়ে ছিলেন। এর প্রমাণপত্রের জন্যে তখনকার মুসলমান সম্পাদক প্রকাশকদের পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠা হালকাভাবে উলটে দেখলেও চলে।

সাতচল্লিশের পরে পূর্ববাংলায় সাহিত্যের কলম হাতে আমরা যখন আসতে শুরু করেছি— তখন কবিযশোপ্রার্থী কিংবা বলা যাক কবিকর্মীই— বাঙালি মুসলমানের সম্মুখে স্বাভাবিক ছিলো— স্বাভাবিক হয়ে ওঠারই কথা ছিলো— দু’জন কবির যে কোনো একজনের পথে প্রথম পা’টি ফেলা— নজরুল অথবা জসীমউদ্দীনের।

ভুলে গেলে চলবে না, নতুনের পথ প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে অনুকরণের, পূর্বগতগণদের রচনার আদর্শে লিখনের, মাধ্যমেই শুরু হয়। একজন জীবনানন্দও নজরুলের, একজন বুদ্ধদেব বসুও রবীন্দ্রনাথের আদলেই লেখা শুরু করেন, এ সংবাদ তো আছেই।             

কিন্তু আমরা নজরুলের কাছে যাইনি, জসীমউদ্দীনের কাছেও নয়; আমরা তিরিশের কবিদের দিকে চোখ ফিরিয়েছি— এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আগে আমরা তিরিশের কবিদের কাজটিকে শিক্ষানবিশের মেধা-মনোযোগে দেখে উঠেছি। এখানে চট করে এ কথাটিও বলে রাখি যে, আজ বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার বিস্তার, মান ও প্রভাব দেখে এটা মনে করা ভুল হবে যে আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিবিড়ভাবে জানতে শুরু করেছি ষাট বছর আগে সেই তখন থেকেই। আমরা রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করেছি, তাঁকে আদ্যোপান্ত পড়েছি ও তাঁর কাজটিকে অনুভব করে উঠতে শুরু করেছি ষাটের দশকের শুরু থেকে মাত্র— ততদিনে আমাদের অনেকেই সাহিত্যের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছি।

তিরিশের কবিদের পরেপরে, প্রায় একসঙ্গেই চল্লিশের কবিদেরও স্বর আমরা শুনতে চেষ্টা করেছি। অন্য কোনো শব্দের অভাবে ‘চেষ্টা’ শব্দটিই আমি ব্যবহার করছি— এই চেষ্টার কথাটি ইতিহাসে লিখে রাখবার যোগ্য। পূর্ববাংলায় তখন জনমানুষের ভেতরে সমসময়ের সাহিত্যরুচি বা আধুনিক চিন্তাচেতনা বলে তো কিছু ছিলোই না, বইপত্রেরও ছিলো দুর্ভিক্ষ। একটি উদাহরণই যথেষ্ট— ঢাকায় কি গোটা পূর্ববাংলায় বুদ্ধদেবের ‘নতুন পাতা’-র, কিংবা জীবনানন্দের ‘ঝরা পালক’-এর— একটি মাত্র কপি বিনা দ্বিতীয় কপি ছিলো না— সেই নবীন বয়সে আমাদের জানা মহলে কারো কাছে, কিংবা কোনো বইয়ের দোকানে। এভাবেই আমরা বড় হয়েছি, কবিতায় কিছু হয়ে ওঠার— যদি হয়ে থাকি!— চেষ্টা করেছি।

তিরিশের কবিরাই প্রথম আমাদের পথ দেখান। কিংবা, পথে ডাকেন। তাঁদের সেই ডাক যে কতটাই দুর্মর ও সম্মোহনী ছিলো, আজ পেছন ফিরে— কারো কারো জীবন-অবসান, কারো কারো কলমের কালিহ্রাস লক্ষ করে আজ দেখি— আমাদের ভেতরে সবচেয়ে খ্যাতিমান যিনি ছিলেন, এবং পশ্চিমবঙ্গে সর্বাধিক পরিচিত— আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত তিনি তিরিশেরই সম্প্রসারণ বলে নির্ণীত হবেন— চল্লিশের স্বর ও বক্তব্য মিশ্রণে তাঁর কণ্ঠ কিছুটা আলাদা মনে হলেও, তিরিশই তাঁর প্রধান উত্স এবং গতিখাত। আর, তাঁরই তুল্য পরিচিতি আরেকজন যাঁর পশ্চিমবঙ্গে, তিনি জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দের কাছ থেকেই সুতো কেটে বস্ত্র বয়ন করেছেন। আমি মনে করি না যে এঁদের কেউই বাংলাদেশের কবিতায় নতুন কোনো স্বর সৃষ্টি করতে পেরেছেন। বাংলাদেশের মতো দেশে গত চল্লিশ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রচারমাধ্যমের উত্কট নায়ক-অনুসন্ধানের ফল দাঁড়ায়— এখনো তাই— যে, সাহিত্যের তথা শিল্পেরই আনুপূর্বিক বোধ ও বিচার কম্বলঢাকা পড়েই থাকে।

ওই ষাট বছর আগে আমাদের প্রথম সেই সময়টা, আমাদের ও-দেশে আধুনিক সাহিত্যের সেই উষাকালের কথা— যখন আমরা— বাঙলি মুসলমানেরা হয়তো প্রথমবারের মতো পরিষ্কার একটা সত্যের ভেতরে নিজেদের আবিষ্কার করতে শুরু করেছি যে ‘মুসলমানি দেয়াল-ঘেরা সাহিত্য’ আত্মঘাত ভিন্ন কিছু নয়—  তখন আরো একটি ব্যাপার চলছিলো, বোধহয় পশ্চিমবঙ্গেও, সেটা এখানে বলা দরকার। ব্যাপারটি হচ্ছে— বাংলা কবিতার পর্যায়ক্রম আঁকা। প্রবন্ধে প্রবন্ধে, সাহিত্যিক আসরে ও সমাবেশে, আলোচনায় ও স্তুতি নিবেদক অনুষ্ঠানে— তখন বলা হচ্ছিলো যে, বাংলা কবিতার ধারাটি বয়ে এসেছে— রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত, এই খাতে। সন্দেহ করি, রবীন্দ্রনাথের নামটি করা, কেবল তাঁকে বাদ দেয়া যাবে না বলেই! আসলে নজরুল এবং সুকান্তই হচ্ছেন বাংলা কবিতায় তখন-এখনকার দুই প্রেরিত পুরুষ।

এটা ছিলো শিল্পের সাধনে নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলা কথা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটাই যে সাহিত্য রচনার তাড়ন-শক্তি, এই পাঠে মজাবার সময় ছিলো সেটি। মানুষ রুটি খেয়েই শুধু বেঁচে থাকে না— এ কথা থেকে সরে এসে, বরং রুটিই সত্য— এই ব্যবস্থাপত্রে বাংলা সাহিত্যকে নতুন জীবন দেবার পরামর্শ আমরা পাচ্ছিলাম। বাংলাদেশে তখন এ পরামর্শের গ্রহীতা হয়ে উঠছিলেন গল্প-লেখকেরা; সৌভাগ্যের কথা— কবিরা ও-পথে পা বাড়াননি। দুর্ভাগ্যের কথা, হয়তো সামরিক শাসন ও যুদ্ধজনিত বাস্তবতার কারণেই, অনেক পরে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরবর্তীকালে ‘রুটিই সত্য’ ওই ব্যবস্থাপত্র আমাদের কবিতা গ্রহণ করে— ‘কবিতা‘ বলছি বটে, বাংলাদেশে অ-কবিতারই কাল এসে পড়ে— যা এখনো আমরা দেখছি।

ষাট বছর আগে, ওই সময়টায়, আমরা রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত এই ছকটি গ্রহণ করিনি বটে, কিন্তু কান বন্ধ রাখতে পারিনি ওই ধারায় রচিত কবিতার কলরব থেকে। চোখ বন্ধ রাখা যায়, কানের সে সুবিধে নেই। কানে এসে পৌঁছোয়ই। তবে সবটাই যে কলরব— তাও ঠিক নয়; ওরই ভেতর থেকে কিছু ভালো কবিতাকেও শনাক্ত করা যাচ্ছিলো— যেমন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের, গোলাম কুদ্দুসের, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের, রাম বসুর— আরো কারো কারো হয়তোবা। এবং অরুণ মিত্র-র, যাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে কথা বলবার জন্যে বাংলাদেশ থেকে আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।

মনে পড়ছে অরুণ মিত্র-র সেই দুটি রচনার কথা : ‘লাল ইস্তাহার, আর, ‘কসাকের ডাক : ১৯৪২’। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত এই পর্যায়ক্রম যাঁদের আকৃষ্ট করেছিলো, অরুণ মিত্রকে আমাদের মনে হয়েছে তিনি তাঁদেরই একজন।

মনে করুন লাল ইস্তাহারের সেই পঙিক্তগুলো : যেন সুকান্তই কথা বলছেন : নয় কি?— ‘প্রাচীরপত্রে পড়োনি ইস্তাহার? 

লাল অক্ষর আগুনের হল্কায়

ঝলসাবে কাল জানো!

(আকাশে ঘনায় বিরোধের উত্তাপ,

ভোঁতা হয়ে গেছে পুরনো কথার ধার।)

যুগান্ত উত্কীর্ণ : এখনি পড়ো

নতুন ইস্তাহার।’

অকালে গত না হলে সুকান্তই হয়তো এই কবিতাটি লিখে উঠতেন : এর সংকেতও অরুণ মিত্রই দিয়ে ওঠেন তাঁর ‘সুকান্ত’ কবিতায়, যেখানে তিনি বলেন :

‘মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল সুকান্ত? যে ছোট্ট বুকটা আর ছোট্ট মাথাটা অনবরত কবিতায় উথলে উঠত তাদের নিঃশব্দ শেষ ডাক শুনতে পাওয়া গেলো না।’

অরুণ মিত্র আশা করছেন—

‘যাদবপুর হাসপাতালের মাঠ বাড়ি পুকুর তার আওয়াজে গমগম করতে থাকবে। ভালোবাসার, আশার, নৈরাশ্যের, মৃত্যুর, আরোগ্যের, সংগ্রামের সেই উদ্দাম হারানো ভাষা যাদবপুরের রোগীদের বিছানা ছাড়িয়ে আমাদের সকলের ঘরে এসে তোলপাড় বাধিয়ে দেবে।’ 

                সেই তোলপাড়টাই যেন শুনে উঠি অরুণ মিত্র-র কসাকের ডাক : ১৯৪২ কবিতায়। এ থেকে শোনা যাক :

                ‘কৃষ্ণসাগরের কাল ফণায় অপূর্ব আক্রোশ—

                দুশমন!

                আজভের মাথার উপরে ঝাপট,

                ডনের রক্তস্রোতে ডাক :

                সাথী, কাঁধে কাঁধ মেলাও—

                সাদা রুশিয়ার ভাই হো

                বড় রুশিয়ার ভাই

                                সারা দুনিয়ার ভাই হো

                                একসাথে দাঁড়াই

                                দুশমন রুশিয়ার

                                দুশমন দুনিয়ার

                                হাতিয়ার দাও ভাই হো।

                                                হাতিয়ার।’

আমরা শুনেছি পশ্চিমবঙ্গে তখন জনসভায় জনসভায় এ দুটি কবিতার একটি বা দুটিই আবৃত্তি করা হতো; জনতার রক্ত আগুনের তাপে টগবগ করে উঠতো। বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান, আর তখন গোটা পাকিস্তানেই ছিলো কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ, ফলে ওদের জনসভা হবার কোনো ব্যাপারই ছিলো না, কিন্তু আমাদের যুবসম্প্রদায়— যারা তখন পাকিস্তানের শোষণযন্ত্রের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে উঠছে ও নিজেদের কথাগুলো বলবার জন্যে রাজনৈতিক মঞ্চের অভাবে সাহিত্যকে আশ্রয় করতে শুরু করেছে— আশ্রয় বলতে, সাহিত্যিক বন্ধুদের প্রাণিত করবার চেষ্টা করছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করতে তারা ছিলো ক্লান্তিহীন, সেই তাদের সঙ্গে নিরন্তর আমাদের যোগাযোগ হতো, আমরা আমাদের আর্থিক দুস্থতা সত্ত্বেও অন্ন ভাগ করে গ্রহণ করতাম— আক্ষরিক অর্থেই, বিরতিহীন চষে ফিরতাম ঢাকার রাজপথ, মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের সঙ্গ আমাদের ভোর থেকে চলেই চলে থাকতো।

                আগেই বলেছি, ঢাকায় তখন আমাদের মধ্যে গল্প-লেখকেরা তাদের সাধনে হাত মেলান, কিন্তু কবিরা কি? না। এটা ইতিহাসেরই কাজ বলে আমি মনে করি; ইতিহাসই আমাদের দিয়ে কাজটা করিয়ে নিয়েছে— নইলে কী করে কিশোর ও প্রথম যুবক আমরা, সহজে নমনীয়, অনায়াসে ভ্রান্ত যাদের হবার বয়স, সেই আমরা কী করে রুটির পাশাপাশি গোলাপটিকেও লক্ষ্য করি— যাপিত জীবনের দুটি মুখই আমরা দেখে উঠি— বাইরের ও ভেতরের— অস্তিত্বের ও আত্মার? শামসুর রাহমানের প্রথম বই তখনো বেরোয়নি, মনে পড়ছে তিনি তখন ভাবছেন তাঁর প্রথম বইয়ের নামটি হবে ‘রুটি ও গোলাপ’; যদিও পরে তা তিনি বর্জন করেন— কিন্তু তখনকার আমাদের কবিতা-ভাবনার সংকেত হিসেবে প্রতীক দুটি এতে খারিজ হয়ে যায় না।

                সেই পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি, ষাটের দশকের শুরুটা— তখন পর্যন্ত আমরা অরুণ মিত্র-র লেখা বড় একটা পড়ে উঠিনি, কেবল ওই ‘লাল ইস্তাহার’ আর ‘কসাকের ডাক : ১৯৪২’ কবিতা দুটির তখনকার জনপ্রিয়তা সূত্রে তাঁকে আমাদের জানা। আমাদের মধ্যে তখন রাজা হয়ে ভূমিশাসন করছেন সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, বিষ্ণু দে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় আমরা কেউ কেউ লিখছি, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-র ‘কুলায় ও কালপুরুষ’ পাঠ করছি বাইবেলের মতো, বিষ্ণু দে-র এলিয়ট অনুবাদ, বুদ্ধদেবের বোদলেয়ার অনুবাদ, বুদ্ধদেবের কালের পুতুল, আমাদের নদীপথে তখন বিকন বাতির মতো জ্বলছে; অরুণ মিত্র তখনও আমাদের দৃষ্ট্পিথে আসেননি। আমরা জানতামই না যে, যেকালে তাঁর স্লোগানতুল্য কবিতা দুটির কথা জানছি, তখনই তিনি দেশে নন, বিদেশে, ফরাসি দেশে; জানছি না যে ফরাসি কবিতার দিকে তাঁর চোখ পড়েছে; ঢাকায় বসে তখন আমাদের জানবার কথাই নয় যে দেশে ফিরেও তিনি অধ্যাপনা নিয়ে পশ্চিমের বাঙালির জীবন যাপন করছেন এলাহাবাদে; সর্বোপরি তাঁর কবিতায় বাঁকবদল যে ঘটেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটিও আমাদের কাছে ছিলো একেবারেই অজানা— অন্তত আমার কাছে— তখন পর্যন্ত।  

                কখন পর্যন্ত? সেটা ১৯৬৪ সাল। আমাদের মধ্যে প্রয়াত কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্্, তাঁর একটা দিক ছিলো— কলকাতার সঙ্গে অন্তঃশীল তাঁর একটা যোগাযোগ ছিলো সেই বাহান্ন সাল থেকেই, গোপনস্রোতের মতো তাঁর ভূগোলে এসে পড়তো কলকাতার বই— কবিতা, প্রবন্ধ আর বিশেষ কিছু পত্রিকা, লিটল ম্যাগ নামে একালে যার ছড়াছড়ি। বাংলাভাষায় সমসময়ের গুরুত্বপূর্ণ লেখার খোঁজ ও পাঠ করবার সুযোগ তাঁর কাছেই আমি পেতাম। সেই তিনি ১৯৬৪ সালে একটি বই আমাকে পড়তে দেন, অরুণ মিত্র-র কবিতার বই ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’। আমাকে পড়তে দেন বললে ভুল হবে, আমাদের দেন, সেই আমাদের মধ্যে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান এই দু’জনও ছিলেন। আমাদের মধ্যে আমি তখন গদ্য বা ভাবছন্দ আমি যাকে বলি অনেক তাতে লিখে চলেছি, আর লিখতেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্///। ঘনিষ্ঠ তাপ খুলে ধরেই অরুণ মিত্র-র সঙ্গে আত্মীয়তার বিদ্যুতে স্পৃষ্ট হয়ে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গেই। রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’, বুদ্ধদেবের ‘নতুন পাতা’, উজিয়ে নতুন এক কণ্ঠস্বরের আওয়াজ শুনে উঠলাম আমরা। ‘ঠাহর করে দেখে বুঝলাম’— না, আমার নয়, অরুণ মিত্র বলছেন—

‘ঠাহর করে দেখে বুঝলাম এই ভিড়ের মধ্যে যারা আছে তারা প্রত্যেকেই আমার খুব অন্তরঙ্গ।’

বলছেন তিনি—

‘ঘুমের দরজা ঠেলে তারা ঢুকল। কোন্্ ভোরের নদীকে ছুঁয়ে এসেছে, কোন্্ কচি পাতায় হাত বুলিয়ে এসেছে তার ঘোর যেন তাদের সর্বাঙ্গে লেগে আছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম।’

                অবাক হয়ে দেখলাম আমরাও। একজন কবিকে। আমাদের মধ্যে। যেন তাঁর জন্ম হলো বাংলাদেশের ভূমিতে। আরো একবার। হয়তো পশ্চিমবঙ্গেও। বাংলাদেশ থেকে দেখা ছবিটির দিকে তাকিয়ে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’ থেকেই অরুণ মিত্র হয়ে ওঠেন আজকের অরুণ মিত্র— তাঁর বিশিষ্ট স্বাক্ষর ও স্বর নিয়ে।

                ওই বইটির ‘ঘুমের দরজা ঠেলে’ কবিতাটি— যার তিনটি বাক্য উদ্ধৃত করেছি এইমাত্র, তার শিরোনামটাই যে তাত্পর্যপূর্ণ এবং অনুজবৃন্দের কাছে সংকেতময়, সেটা দেখে উঠি শঙ্খ ঘোষের একটি লেখায়। তাঁর এই লেখাটি আমি মনে করি অরুণ মিত্র-র ওপরে এ যাবত্ আমি যা দেখেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গভীরবোধসম্পন্ন একটি লেখা। কবিকে সংবর্ধনা দেন যে সমিতি তাঁদের প্রকাশিত ‘কবি অরুণ মিত্র’ নামে বইটির অন্যতম সম্পাদক হিসেবে শঙ্খ ঘোষ লেখেন :

‘কোনো কোনো কবিতা আছে, পড়বার সঙ্গেসঙ্গেই পাঠককে যা আন্দোলিত করে তোলে, একজন থেকে আরেকজনের মুখে মুখে ফিরে অনায়াসে যা হয়ে ওঠে সকলের। কিন্তু আরেকরকম কবিতা আছে, যার বাইরের কোনো ঠমক নেই, জৌলুশ নেই, অর্ধমনষ্ক পাঠককে কাছে টেনে নেবার মতো কোনো বড়রকমের আড়ম্বর নেই, আছে কেবল কথা বলার একটা মগ্ন স্রোত। একবার সেই স্রোতের মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেলে যেন দরজার পর দরজা খুলে যেতে পারে আমাদের চৈতন্যের সামনে, অল্পে-অল্পে তখন আমাদের সমস্ত শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেইসব কবিতা, অনেকদিন ধরে। আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হল, ঘুমের দরজা ঠেলে, সেইরকমই এক কবিতার জগতে আমাদের নিয়ে চলেছেন অরুণ মিত্র।’

বাংলাদেশে আমরাও যেন ঘুমের দরজা ঠেলে একজনকে আবির্ভূত হতে দেখলাম, যিনি তাঁর কবিতায় প্রাথমিক সেই— শঙ্খ ঘোষের ভাষায়— প্রখরতা, ঝংকার এবং ঘোষণা থেকে বেরিয়ে এসে মগ্নস্রোতের একটি নদী হয়ে ওঠেন কবিতায়।

 

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

অরুণ মিত্র (০২ নভেম্বর ১৯০৯—২২ আগস্ট ২০০০)