হাসু কাকা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:১২

এক.

সকালে হাজাম এল। লিকলিকে কালো লোকটা। রস করে কথা বলে। দেখে মনে হয় না, সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছোট বাচ্চাদের কষ্ট দিয়ে বেড়ায়, কষ্ট নিতে না চাইলে দাবড়ে ধরে আনে—কষ্ট দিতে পারলেই তার রোজগার। আমি গাছে উঠে গেলাম। নিচ থেকে গাছটাকে অনেক উঁচু মনে হচ্ছিল, ওপরে উঠে মনে হলো গাছটা মাটি ছুঁইছুঁই—সবাই আমার পা ধরে ফেলবে। হাসু চাচা চাইলে পা না, কান ধরেও নামিয়ে আনতে পারে। সেই রকম আয়োজনই সে করছে। কাছা মেরে হাতের চেটোয় থুতু ছিটাচ্ছে। আমি হুমকি দিলাম, ‘লাফ দেবো কিন্তুক!’ কাকা কাছা ছেড়ে দিলো, অনুনয় বিনয় শুরু করল। অন্যরা সায় দিচ্ছে। আমি বললাম, ‘না, ব্যথা লাগে।’ হাসু কাকা বলল, ‘একবারই তো।’

‘না, ব্যথা লাগে।’

‘দেরি হলি বেশি ব্যথা পাবি।... নাইমে আয়, বাপ।’

‘না, ব্যথা লাগে।’

‘একবার একটু ব্যথা পাতি হয়।’

দেরি হলে ব্যথা বাড়বে, কাকার এই কথায় ভয় আরও বাড়ল, তাই একটু সাহস বাড়ল। অসহায় যখন বোঝে সে অনন্যগতি, তার সাহস বেড়ে যায়। আমি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তারপর?’ কাকা বললেন, ‘তারপর ব্যথা সাইরে যাবি।’ আমি আবারও গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তারপর?’

‘ফুটবল খেলতি পারবি... তোর একটা ডিয়ার বল কিনে দিবানে।’

 

দুই.

সন্ধ্যায় গনি চাচা মাথায় টুপি দিয়ে দেখতে এসেছিল। দুইবার দোয়া পড়ে ফুঁ-দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিরামের লাইগতেছে?’

‘ব্যথা।’

‘তা’লি বোঝো, কিরাম লাগে—খালি একটা অঙ্গ কাইটে ফ্যালেছে, তাই ব্যথা-ব্যথা কইরতেছ—পুরো শরীরটা যখন কাইটে ফেইলবি, তখন কিরামের লাগবি?... তয় সুখীর কতা কী জান বাপু, ওই ব্যথা একবারের বেশি পাতি হবি নে?...’ গনি চাচা মারফতি করছে। আমি পাশ ফিরলাম।

তিন.

হাসু কাকাকে ডিয়ার বলের কথা মনে করিয়ে দিলে সে আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, ভিজে পাটের গোছা আড়ায় তুলে দিতে থাকে, গরুর গোড়ায় খড়বিচালি সাজাতে থাকে, দা নিয়ে বসে শুকনো নারকেল ছুলতে থাকে। বেশি ঘ্যানঘ্যান করলে গামছার কোনা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে বলে, ‘দিবানে, বতর উঠুক।’ আমি মুখ ভার করে চলে আসি। মনে মনে ভাবি, কাকা একটা চালাক কাকা, আর আমি একটা বোকা ভাতিজা—নাহলে কি আমার এরকম অঙ্গহানি হয়?

অঘ্রান মাস এল। মাঠের সব ধান উঠোনে উঠে আসছে। মাঠের পর মাঠ খালি হয়ে যাচ্ছে। হাসু কাকা কাঁচি দিয়ে পুঁচিয়ে পুঁচিয়ে ধান কেটে আঁটি বেঁধে নিয়ে আসছে গরুর গাড়িতে করে। আমি গাড়ির সামনে দুই পা দুই দিকে ঝুলিয়ে বসে, মাথা ঢুলাতে ঢুলাতে, বাড়ি আসছি। কাকা হেই-হৈ করে গরু তাড়াচ্ছে। খলাটে এসে গাড়ি থামলে, আমি গাড়ির ওপরে উঠে গিয়ে, আঁটি ধরে ধরে উঠোনে ছুড়ে মারছি। কাকা ধানের পালার ’পরে দাঁড়িয়ে দুই হাতে ছুড়ে দেওয়া আঁটি ধরছে, পালায় গোল করে সাজাচ্ছে। আঁটির গা গরম—মাঠের রোদ যেন বুকে করে নিয়ে এসেছে; আঁটির গায়ে ভাপা গন্ধ—মাটির সুঘ্রাণ—কেমন আশা জাগে বুকে। ফুটবলটা বোধহয় পেয়েই যাব এবার।

মাঠ খালি হয়ে গেল—ধানের মোথা, কবুতরের ভাঙা ডিম, আর মরা শামুক ছাড়া আর কিছু নেই। ফুটবলটা হলে ভালো হতো। মাঠে মাঠে দৌড়াতে পারতাম। জলিল-সুজনরা এসে খোটা দিয়ে যায়, ‘তুই না খতনা কইরে ফুটবল পাইস?’

হাসু কাকা ভোররাতে উঠে হেই-হৈ করে গরু নিয়ে মলন মলে। কাকিরা কুলোয় করে উত্তুরে বাতাসে ধান উড়োয়—খড়কুটো চিটাধান আলাদা করে। আমার কথা শোনার সময় ওদের নাই।

শীত এসে পড়ল। ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে গুঁড়ো করে ফেলল—গোলা করে চিতই পিঠা বানিয়ে ফেলছে, ফুটবল কিনে দিচ্ছে না। আমি আর বলব না। অনেক বলেছি—বললেই, সেদিন সন্ধ্যায় চিতই পিঠা বানাতে বসে, হেঁসেলের পাশে বসে শাকঘণ্ট দিয়ে শুধু চিতই পিঠা খাওয়ায়।

সন্ধ্যায় কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে। মাঝে মাঝে সুর করে লক্ষ্মীপেঁচা ডেকে ওঠে। একদিন হেঁসেলের সামনে ধুপ্ করে কী যেন এসে পড়ল। কাকি ‘ও মাগো’ বলে এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে নিল। হাসু কাকা কোত্থেকে এসে দড়াম করে একটা লাথি মেরে সেটাকে উড়িয়ে দিলো—হাসছে, ‘নে তোর ফুটবল।’ আমি উঠোনে গিয়ে অন্ধকারের ভেতর থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এলাম।

 

চার.

হাসু কাকা অসুস্থ—ব্রেইন টিউমার। তার মাথায় ফুটবলের মতো একটা টিউমার হয়েছে। ঢাকায় এসেছেন। কোন নিউরো-হসপিটালে যেন ভর্তি আছেন। আমি খুঁজে খুঁজে দেখতে গিয়েছিলাম। লালকালিতে হাসপাতালের নাম প্রিন্ট-করা একটা সাদা চাদরের নিচে চিত্ হয়ে পড়ে আছে, কারোর দিকে তাকায় না, ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাকি বেডের ওপরে পা ঝুলিয়ে বসে মাথায় আঁচল টেনে কাকার মুখে চেয়ে থাকে—দাঁত দিয়ে চেপে ধরে আঁচলের কোনা কাটে। ছোট একটা মাথা কারিক। কাকা তাকায় না। মানুষের দিকে তাকালে মায়া বাড়বে—গনি চাচা মারফতি করে গেছে। কিন্তু আমার দিকে তাকাল—আঙুল তুলে কোনার বেডটা দেখিয়ে বলল, ‘গতকাইল সকালে’; তারপর মাঝের একটা বেড দেখিয়ে বলল, ‘গতকাইল বিকেলে’; তারপর তার পাশের বেডটা দেখিয়ে বলল, ‘আইজ দুপুরি’। কাকার তর্জনীর সাথে সাথে আমি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তিনটা বেডই দেখলাম—তিনটাই খালি। কাকা বলল, ‘যে সিরিয়ালে অপারেশন হইছে, সেই সিরিয়ালেই মরেছে।’ আমি একটু থেমে বললাম, ‘কিন্তু অপারেশন তো করতে হবে, কাকা।’

‘তা হবি।...ভয় করে।’

‘ভয়ের কিছু নেই।’

‘থাকবিনে ক্যান? ভয়ের জিনিস—ভয় থাকবি নে?’

‘একবারই তো।’

‘তারপর?’

আমি চমকে উঠলাম। কাকার দুই চোখের পানি দুই দিক দিয়ে বেয়ে পড়ল।

আগামীকাল ওনার অপারেশনের তারিখ ফেলেছে।