বাংলার পালা-পার্বণ

রাসপূর্ণিমা নদীয়ারীতি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:০১

মুহুর্মুহু উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি আর অনবরত কীর্তন রাতের দুধ-সাদা জ্যোত্স্নায় পার্থিব ধরা ভজনা আর বন্দনায় কেমন যেন অপার্থিব হয়ে উঠেছে। নারীদের অংশগ্রহণে লীলাকীর্তন পরিপূর্ণতা যেন পেয়েছে পুরোটাই। চলছে রাসলীলা পালন। 

পর পর তিনটি গোল চাকতি সিঁড়ির মতো করে সাজিয়ে। তার মাথায় বসানো হয় রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ। সিঁড়ি করে লীলাচাকতির ওপরের মাচানে বসেন পুরোহিত। নিচের দিকে পর পর সাজানো তিনটি কাঠের চাকতিতে সারি করে সখা আর সখীগণ। নিচের চাকতিতে ৮ জন সখা ৮ জন সখী মোট ১৬ জন। যারা হাত ধরাধরি করে আছে। এর ওপরেরটাতে ৬ সখা, ৬ সখী আর সবার ওপরেরটাতে ৪ সখা ৪ সখী। লীলাচাকতি একটু উঁচুমতো জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, হাতে চাপ দিলেই ঘুরতে থাকে। তবে এই লীলাচাকতি ঘোরাতে হবে লগ্নে। এই বছরের রাসপূর্ণিমার লগ্ন শুরু রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে। কাজেই লীলায় অংশ নিতে আসা কৃষ্ণভক্তরা বসে আছেন লগ্নের প্রতীক্ষায়।

শঙ্খে লগ্ন শুরুর সংকেত দিতেই শুরু হয়ে যায় উলুধ্বনি। লীলাচাকতি ঘুরতে শুরু করে। সকল নারী-পুরুষ চায় একটু হাতে ছুঁয়ে দেখতে, বিগ্রহসমেত লীলামঞ্চ। চারদিকে জটলা করে নারী-পুরুষ লীলামঞ্চ হাতে ঘুরিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ একটু হাতের ছোঁয়া লাগাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। অবশ্য এই রাসলীলা ব্রত পালনে রমণীরাই এগিয়ে। এই হলো রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে সাজানো রাধা-কৃষ্ণ ভজনা বা রূপক রাসপূর্ণিমা পালন।

বারহাট্টা রোড আর বড় বাজার রোড গিয়ে মিলেছে আখড়াবাড়িতে। আখড়াবাড়ির সামনে সাজানো হয়েছে বিশাল গেট। ভিতর বাড়িতে সেই সকাল থেকেই বাটনা বাটা, কুটনা কোটা, রান্নার চলছে ধুম। স্তূপ করে রাখা হয়েছে কুলার মতো বড় বড় সবুজ আর লালের আভায় পদ্মপাতা। ভক্তকুলের অন্ন পরিবেশনের জন্য আটপাড়া বিল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এসব পদ্মপাতা। অনবরত চলছে পদ্মপাতায় প্রসাদ বিতরণ। আখড়াবাড়ির আঙিনায় চলছে অষ্টপ্রহর হরিনাম কীর্তন। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে, লোক সমাগম আর বিশাল সরগরম আজ আখড়াবাড়ি। দূর থেকে দেখেই বোঝা যায় আখড়াবাড়ির আয়োজন কতটা ব্যাপক।

এবছর ১ শত ২৭ বছর পূর্ণ করল নেত্রকোনার আখড়াবাড়ির রাসলীলা পালন। গুরু দয়াল সাহা এই রাসলীলার প্রবর্তন করেন। ধর্মপ্রাণ গুরুদয়াল নদীয়ার বৃন্দাবনের শান্তিপুর গ্রামে ছিলেন। নিজ বাড়ি ফিরে নিজের প্রার্থনালয়ে সেই শতবর্ষ আগে কৃষ্ণনগরের বর্ষানা আর নন্দগাঁও-এর মধ্যে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল তার পরম্পরা চালু রাখতে এই আয়োজন।          

কার্তিক মাসে চারদিকে ধানকাটার ধুম, ঠিক এই সময়ে শহরের মানুষজন হঠাত্ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের সকলে ব্যস্ত কার্তিকব্রত বা কার্তিকপূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমা পালনে। আখড়াবাড়িকে কেন্দ্র করে বসেছে মেলা। সব পালা-পার্বণকে কেন্দ্র করেই মেলা বসে। এই মেলার বৈশিষ্ট্য লোহা আর পিতল-তামার তৈজসপত্রের আধিক্য।

কার্তিক পূর্ণিমার রাতে অনুষ্ঠিত হয় রসিক কৃষ্ণের রাসলীলা। ‘রাস’ এসেছে ‘রস’ থেকে। ‘রস’ মানে আনন্দ, দিব্য অনুভূতি, দিব্য প্রেম। ‘লীলা’ অর্থ নৃত্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে লীলা করবেন। ‘চীরহরণের’ পর গোপীদের সঙ্গে তাঁর এই লীলা। গোপীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কবে তাদের ডাক আসবে তাদের প্রাণপ্রিয় সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে। অষ্টসখী, ললিতা, বিশাকা, চিত্রা, ইন্দুরেখা, চম্পকলতা, রঙ্গদেবী, তুঙ্গবিদ্যা, সুদেবী সকলে জগত্ পরিবার রেখে তৈরি। ক্ষণিকের ঘন অন্ধকার কাটিয়ে কার্তিকের পূর্ণিমার চন্দ্রালোকে বৃন্দাবন আলোকিত। চন্দ্রালোকের শুভ্র আলোয় আবেগের বিস্ফোরণে সখীকুল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পেলেন মিলনের বার্তা। বেজে উঠল কৃষ্ণের বাঁশরী।

দীর্ঘ অসন্দর্শনে সখার মন আজ বিরহকাতর। প্রাণপ্রিয়ার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় তাদের মন ক্ষত-বিক্ষত। ফিরে আসে যেন বৈষ্ণব পদাবলীর সেই পদ—

‘সই কে বা শোনাইলো শ্যামনাম,

কানের মরমে পশিল গো

আকুল করিল মোর প্রাণ’।

ঘর ফেলে বৃন্দাবনের পাড়ে ছুটল গোপীরা। হিন্দুশাস্ত্র থেকে শুরু করে ভাষা-সাহিত্য বা বৈষ্ণব পদাবলী সবখানেই কার্তিক মাসের পূর্ণিমার চাঁদের তুলনা করা হয় দীর্ঘ বিরহ শেষে মিলনের। আর এই মিলনের ক্ষণে যে লীলা হয়, তারই নাম ‘রাস-লীলা’।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই দিন বৃন্দাবনের গোপিনী সকাশে রাধার সঙ্গে রাস উত্সবে মেতেছিলেন গোপশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ। গোপিনীদের নাচ ও শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছিল বৃন্দাবন। পরবর্তীকালে শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণের এই মিলন উত্সবকে শ্রীচৈতন্যদেব নাম-সংকীর্তনের মধ্যদিয়ে রাস মহোত্সবে পরিণত করেন। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, কেউ যদি তাঁকে জানতে চায়, তবে তাঁকে অবশ্যই ভক্তির আশ্রয়ে থাকতে হবে। এই দিনে তাই বৈষ্ণব ভক্তরা তাঁদের ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মেতে ওঠেন রাসলীলায়।

চৈতন্যজন্মভূমি নদীয়ায় বসে মহারাস। পূর্ণিমার ভরা রাতে, বিশুদ্ধ তন্ত্রমতে শতাধিক শক্তিমূর্তির সাড়ম্বর পুজো, সঙ্গে আদ্যন্ত তামসিকতায় ভরা এক দামাল উত্সবের উদ্যাপন। সংক্ষেপে এটাই হলো নদীয়ার নবদ্বীপের রাস। ১৭২৮ থেকে ৮২ সাল নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে জাঁকজমকে রাস পালন শুরু হয়েছিল। রাজা হওয়ার পর থেকে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণচন্দ্র নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকতেন। সমস্যাসমূহ থেকে পরিত্রাণের জন্য তিনি মঠমন্দির স্থাপন, মেলা-উত্সবের সূচনাসহ বহু জনকল্যাণমূলক কাজে মনোনিবেশন করেন। ১৭৫৩ থেকে ৫৬ সালের মধ্যে তিনি জগদ্ধাত্রীপুজো, বারোদোলের সূচনা করেন। ধারণা করা হয়, ওই একই সময়ে রাজা নবদ্বীপে বৈষ্ণবদের রাস উত্সবের নবযাত্রার সূচনা করেন। আরও জানা যায়, কৃষ্ণচন্দ্র নিজে ছিলেন শাক্ত। তিনি একাধারে নদীয়া, অগ্রদ্বীপ, কুশদ্বীপ এবং উলা এই চারটি সমাজের সমাজপতি ছিলেন। তিনি রাসপূর্ণিমার রাতে নবদ্বীপে শক্তিমূর্তি পুজোয় উত্সাহ দেওয়া শুরু করেন। রাজানুগ্রহে কিছুকালের মধ্যেই সেই উত্সব ছাপিয়ে যায় বৈষ্ণবীয় রাসকে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কৃষ্ণভক্তরা রাসলীলা পালন করে থাকেন। মণিপুরের বাসিন্দাদের কাছে রাস একটি প্রধান ধর্মীয় নৃত্য-গীতের উত্সব। শ্রীবিষ্ণু ও শিবভক্তরাও এদিন মন্দিরে গিয়ে তাদের উপাস্য দেবতার পুজো করে থাকেন। পুণ্য অর্জনের জন্য সকাল সকাল নদীতে স্নান করেন। মন্দিরে বাতি বা প্রদীপ জ্বালান, দুঃস্থদের দান-ধ্যান করেন। দীপাবলির ঠিক পরের পূর্ণিমাতেই  দেবদীপাবলি বা এই রাসলীলা পালন করা হয়ে থাকে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এইদিন স্বয়ং ঈশ্বর মর্ত্যে নেমে আসেন গঙ্গাস্নান করতে।

ভক্তরা বিশ্বাস করেন, রাসপূর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণ এখনো বৃন্দাবনের মধুবনে আসেন রাসলীলা খেলতে। সারারাত ধরে তাঁরা সেখানে নাচগান করেন। সেখানে সারারাত থাকেন গোপিনীরা। কেউ কেউ গভীর রাতে নূপুরের নিক্কণ শুনতে পান। আবার দিনের আলো ফোটার আগেই সবাই অদৃশ্য হয়ে যান।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়াসহ অন্যান্য জায়গায়, ওড়িশা, আসাম ও মণিপুরে রাসযাত্রার উত্সব বিশেষভাবে উদ্যাপিত হয়। সেখানে গোপিনীবৃন্দ সহযোগে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা এবং অঞ্চলভেদে কত্থক, ভরতনাট্যম, ওড়িশি, মণিপুরি প্রভৃতি ঘরানার শাস্ত্রীয় ও বিভিন্ন লোকায়ত নৃত্যসুষমায় রাসনৃত্য বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আর আমাদেরও বাংলাদেশে কমলগঞ্জেই শুধু নৃত্যযোগে রাসপূর্ণিমা পালিত হয়ে থাকে। রাস উপলক্ষে দুবলার চরে স্নান হয়। এছাড়া ছোট ছোট আকারে আরো কয়েক জায়গায় রাসপূর্ণিমা পালিত হয়। কার্তিকপূর্ণিমা বা রাস-লীলার অসামান্য প্রেমকাহিনি জগতের সকল প্রেমকাহিনিকে ছাড়িয়ে যায়। প্রেম এবং লীলাকে উপজীব্য করে এত ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠান আর কোথাও হয় না।