দরিদ্রদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করিতেছে সরকারের গৃহীত সামাজিক নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি। আয়ের উত্স সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসে রাখিতেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দুস্থ, দরিদ্র ও পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা-স্বামী নিগৃহীতা-দুস্থ মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি হিসাবে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হইতেছে। ইহা ছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, টিআর, জিআর, দুস্থ মায়েদের জন্য খাদ্য সহায়তা (ভিজিডি) ও চর জীবিকায়নেও এই কর্মসূচির অর্থ ব্যয় করা হইতেছে। এই সকল কার্যক্রমের আওতায় সুবিধাভোগীর পাশাপাশি বরাদ্দের পরিমাণও বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহার পরও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃহত্ অংশ এখনো সামাজিক সুরক্ষার বাহিরে থাকিয়া গিয়াছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য অনুসারে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বা প্রায় চার কোটি। এই সকল মানুষের মাত্র ২৯ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রহিয়াছে। বাকি ৭১ শতাংশ বা দুই কোটি ৮০ লক্ষই রহিয়াছে ইহার বাহিরে। ইহা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যালেঞ্জ।
গত এক দশকের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি দরিদ্র মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হইয়াছে। বর্তমানে ২১টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সামাজিক নিরাপত্তামূলক ৯৯টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করিতেছে। চলতি অর্থবছরেও সকল ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা রহিয়াছে। কিন্তু কর্মসূচির আওতায় সকলের নিকট প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা পৌঁছাইতেছে, এমন বলা যাইবে না। শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচি হইতে সুবিধা পাইতেছেন। অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আবার প্রয়োজনের তুলনায় কম সুবিধা পাইতেছেন। সুবিধাভোগী নির্বাচনেও রহিয়াছে ত্রুটি। বিভিন্ন গবেষণা এবং জরিপেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন দুর্বলতার বিষয়গুলি উঠিয়া আসিয়াছে। ২০১০ সালে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা গিয়াছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত ১৮ শতাংশ পরিবারই ছিল সচ্ছল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাহিরে। কর্মসূচিগুলির প্রায় ৫২ শতাংশই দেওয়া হয় খাদ্য সহায়তা হিসাবে। তবে নগদ অর্থ ইহার চাহিতে বেশি কার্যকর বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিছু কর্মসূচি লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখিলেও অনেকগুলিই অব্যবস্থাপনার কারণে সুবিধাভোগীদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে পারিতেছে না।
অতিদরিদ্রদের এই সকল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি বেশি জরুরি। প্রথাগত কর্মসূচি হইতে বাহির হইয়া সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে পারে এমন উদ্ভাবনী কর্মসূচি নিতে হইবে। সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করিতে সকলকে দারিদ্র্যমুক্ত করিবার বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারে। তবে সকল দরিদ্র মানুষের নিকট লাগসই কর্মসূচি লইয়া পৌঁছানো অবশ্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ইহা অসম্ভব এমন নহে। প্রযুক্তিগত উপায়ে ইতোমধ্যে সকল নাগরিককে অভিন্ন তথ্য ব্যবস্থাপনায় আনা হইয়াছে। অর্থের সংকট নাই বলিলেই চলে। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণে দারিদ্য বিমোচনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিরাজমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হইবার কোনো অবকাশ নাই।
