অভিবাসন প্রত্যাশীদের অনিশ্চিত যাত্রা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৫৮

আন্তর্জাতিক অভিবাসী বিষয়ক সংগঠন আইওএম বলিতেছে, গেল ১১ মাসে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ১ লক্ষ ৭ হাজার অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করিয়াছে। এই সময়ে ২ হাজার ১৩৩ জন অভিবাসন প্রত্যাশী মারা গিয়াছে। ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার অভিবাসী ইউরোপে আশ্রয় লইয়াছে, পথে মারা গিয়াছে ৩ হাজার ১১৩ জন। ইউরোপে নূতন জীবনের স্বপ্ন সম্বল করিয়া প্রবল ঝুঁকি নিয়া জাহাজ বা নৌকায় চড়িয়া বসিতেছেন অসংখ্য শরণার্থী। ভূমধ্যসাগরে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনায় তাহাদের চরম মূল্য দিতে হইলেও গোটা ২০১৮ সাল জুড়িয়া থামিয়া নাই অভিবাসীদের স্রোত। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ৩.৩ শতাংশ মানুষ ইতোমধ্যে অভিবাসী হইয়াছে। পরাশক্তিসমূহের টিকাইয়া রাখা যুদ্ধ, কূটকৌশল ও বিবিধ প্রকারের অবরোধ এবং ইউরোপ-আমেরিকার অভিবাসী সংকটের মধ্যে অবশ্যই একটি যোগসূত্র আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সংঘাত বিপুল মানুষকে শরণার্থী করিয়াছে, যাহাদের বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়াছে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে। তাহাদের কেহ কেহ নিরাপত্তার খোঁজে পাড়ি জমাইতেছে ইউরোপের অনিশ্চিত গন্তব্যে।

ভিন্ন নহে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রও। আধুনিক ইতিহাসের সবচাইতে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বলিয়া বিবেচিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচাইতে ব্যাপক হারে দেশ ছাড়িতেছে। ইতোমধ্যে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী হইয়া বাংলাদেশে আসন গাড়িয়াছে। অন্য অঞ্চলের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে, গত ৪ বত্সরে অন্তত ২৩ লক্ষ মানুষ দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা ছাড়িয়াছে। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য হইতে ইউরোপে অভিবাসীদের যে ঢল নামিয়াছিল, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতিকে তাহার সঙ্গে তুলনা করিয়াছে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা। ছোট ছোট কাফেলা তো নিয়মিতই আসিত, কিন্তু কয়েকদিন আগের খবর হইল, হাজার হাজার অভিবাসী মধ্য আমেরিকান দেশগুলি হইতে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের দিকে আগাইয়া যাইতেছে। তাহারা বলিতেছেন—নির্যাতন, দারিদ্র্য আর সহিংসতা হইতে বাঁচিতে তাহারা নিজেদের দেশ গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস বা এল সালভাদোর হইতে পালাইয়া আসিয়াছেন। এমাসেই নৌকায় করিয়া ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়া ব্রিটেনে আসিবার চেষ্টার সময় শতাধিক অভিবাসীকে উদ্ধার করা হইয়াছে। অভিবাসনের এই প্রবাহ বাড়িতেছে। এই বাস্তবতায়, বিশ্বব্যাপী প্রবল অভিবাসী সংকটের মুখে, অভিবাসীদের মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখিতে কিছুদিন আগেই গত ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালিত হইয়া গেল বিশ্বব্যাপী।

কেহই নিজের ভূমি ত্যাগ করিয়া দেশান্তরী হইতে চাহে না। কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের কারণে কিংবা অর্থনৈতিক কারণে আজ অনেকেই অভিবাসী হইতে বাধ্য হইতেছে। অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলির সহায়তা পর্যাপ্ত নহে বলিয়া সম্প্রতি জানাইয়াছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশন বলিয়াছে, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হইয়াছে বিশ্ব সম্প্রদায়। বস্তুত মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ এখনও ঘটে নাই। ভূমধ্যসাগর তীরে পড়িয়া থাকা শিশু আইলান কুির্দর মৃতদেহ এখনও আমাদের হূদয়ে ভাসিয়া থাকে, টেকনাফ সমুদ্রতীরে পড়িয়া থাকা শিশুর লাশের ছবিও আমাদের চোখে বিধিয়া থাকে। তাই আমরা আশা করিব, অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতি কেবল সদয় হইলেই চলিবে না, তাহাদের অধিকার ও মর্যাদা সংরক্ষণেও যত্নবান হইতে হইবে। সর্বোপরি, অভিবাসনের কারণসমূহ প্রশমনেও কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে হইবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে।