মানুষকে অনুপ্রাণিত করা, মানুষের মধ্যে চিন্তাশীলতা সৃষ্টি করা আজকের দিনে খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মানুষের মনের ভালো-মন্দের সাথে চিন্তাশীলতার একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। মন ভালো থাকলেই চিন্তাশক্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটে কিন্তু মন্দ থাকলে তা বিকশিত হয় না। মন থেকে আসে চিন্তাশক্তি। চিন্তাশক্তি থেকে আসে সফলতা ও নতুন ধারণা। এপিজে আব্দুল কালাম আজাদ সফলতার বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন: ‘সফলতার গল্প পড়ে ধারণা পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় বার্তা। সফল হতে চাইলে পড়তে হবে ব্যর্থতার গল্প। এতে ভালো একটি ধারণা অবশ্যই পাওয়া সম্ভব।’ এখানে তিনি সফল হওয়ার জন্য সফলতার গল্প নয় বরং ব্যর্থতার গল্প পড়ার কথা বলেছেন। বিষয়টাতে অনেকেই অবাক হতে পারেন কিন্তু এতে অবাক হবার কিছু নেই বরং এটাই বাস্তব। কারণ আমরা যদি বিরূপ পরিবেশ ও প্রতিবন্ধকতাকে না চিনতে পারি তবে সেটি কিভাবে দূর করে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব সেটি জানবো না।
প্রসঙ্গক্রমে আমরা সইচিরো হোন্ডার জীবনকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। বার বার ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েও যিনি সফল হবার স্বপ্ন দেখেছেন। খুব ছোটকাল থেকেই তিনি কলকব্জা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে বের হয় যান হোন্ডা অথচ তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। জাপানের রাজধানী টোকিওতে একটি গ্যারেজে কাজ করতে থাকেন যেখানে তাকে কলকব্জা পরিষ্কার ও মালিকের বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে হতো। টয়োটা কোম্পানিতে কাজ করার আগ্রহ থাকলেও সাক্ষাত্কারের পর চাকরিটা আর তার কপালে জোটেনি। কিন্তু এজন্য তিনি থেমে থাকেননি। নিজ ঘরে বসেই স্কুটার বানানো শুরু করেন। ইতিবাচক লক্ষ্যকে স্থির করে রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। মনের ভিতরের অনুপ্রেরণা তার চিন্তাশক্তিকে উদ্ভাবনের প্রতি আকৃষ্ট করে। এর ফলে ১৯৪৬ সালে তিনি মোটরচালিত সাইকেল তৈরি করেন এবং ১৯৪৮ সালে ‘হোন্ডা মোটর কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রম, অনুপ্রেরণা, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাশক্তির প্রভাবে এ কোম্পানি হয়ে উঠে বিশ্ববিখ্যাত হোন্ডা কোম্পানি। বিফলতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি একজন সফল মানুষ হয়ে উঠেন।
খাবারের জনপ্রিয় ব্রান্ড কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স বার বার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সফল হয়েছেন। কখনো রেলওয়ের শ্রমিক, কখনো বিমাকর্মী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন, কিন্তু কোনোটিতেই তার মন বসেনি। ১৯২০ সালে নিজের কিছু জমানো টাকা দিয়ে বোট কোম্পানি খোলেন তারপর যোগ দেন ইন্ডিয়ানার চেম্বার অব কমার্সে। সেখানেও তার মন বসেনি। এরপর কেন্টাকিতে একটি টায়ার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যানের কাজে চাকরি করেন। ১৯২৪ সালে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্টাকির স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির ম্যানেজারের সাথে জানাশুনার সুবাদে তিনি একটি সার্ভিস স্টেশনে চাকরির সুযোগ পান। কিন্তু ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন ছিলো না। ১৯৩০ সালে কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যায়। চল্লিশ বছর বয়সে বেকার হয়ে পড়েন হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। কিন্তু থেমে গিয়ে জীবনকে জয় করার স্বপ্ন তিনি বন্ধ করেননি। খাবার তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সরবরাহ করা শুরু করলেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিবন্ধকতা তার মনের অনুপ্রেরণা ও চিন্তাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৫২ সালে তিনি বাণিজ্যিকভাবে নিয়ে এলেন তাঁর বিস্ময়কর রেসিপি-‘কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন’। শেলবিভিলেতে তিনি একটি রেস্তোরাঁ খুললেন যেখানে শুধু ফ্রাইড চিকেনের এই ডিশটাই বিক্রি করা হতো। লোকজন এই আইটেমটির প্রতি খুব বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ল। বিক্রি করে কুলোতে পারছিলেন না কর্নেল স্যান্ডার্স। শুরু করলেন বিভিন্ন শহরে কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেনের শাখা খোলা। প্রথমে আমেরিকা আর তারপরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো কেএফসি। ১৯৫৫-১৯৬৫ এই দশ বছরে চীন, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেএফসি’র প্রায় ছয়শ’র বেশি শাখা খোলা হয়েছিল। ব্যবসাটি এতটাই লাভজনক হলো যে তা হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সকে বিফল মানুষ থেকে সফল মানুষে পরিণত করল ।
একসময় প্রাচীন রোম ও গ্রিসে ‘জিনিয়াস’ বলতে কোনো ব্যক্তিকে বোঝানো হতো না বরং মনে করা হতো এটি একটি ঐশ্বরিক ক্ষমতা যা মানুষের উপর ভর করে। উত্তর আফ্রিকার মরুভূমিতে সংগীত কিংবা নৃত্যশিল্পী যখন এই শিল্পগুলোর গভীরে চলে যেতেন তখন মনে করা হতো কোন একটি অদৃশ্য শক্তি তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই ঢুকে পড়া অদৃশ্য শক্তিকেই বলা হতো ‘জিনিয়াস’। তারা ভাবতো মানুষ জিনিয়াসের উত্স নয় বরং মানুষের কাছে জিনিয়াস আসে। জিনিয়াস নামের শক্তি যখন চলে যায় তখন মানুষটা আবার সাধারণ মানুষে পরিণত হয়। এর ফলে মানুষ তার অনুপ্রেরণা ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করে সফল হলেও তার কোনো স্বীকৃতি ছিলো না। এটি যেমন ইতিবাচক মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো না তেমনি আধুনিক সমাজ ও মনোবিজ্ঞান বলছে যখন আমরা একজন মানুষকে জিনিয়াস বানিয়ে দেই, তখন মানুষ মনে করতে থাকে সবকিছুর দায়-দায়িত্ব তার একার। ফলে এটি তার মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে যা তাকে সৃজনশীলতা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কারণ এখন আমরা অদৃশ্য শক্তিকে জিনিয়াস বলি না বরং একজন মানুষের মেধা ও সাফল্যের মূল্যায়ন করে তাকেই জিনিয়াস বলি। মানুষের মেধা ও সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার এই বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই ভাবতে পারি। কিন্তু এটি যাতে মানুষটির মানসিকতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না করে সেটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ গবেষণা বলছে, সৃজনশীল মানুষেরা তাদের কাজের ফলাফল নিয়ে এক ধরনের দুশ্চিন্তায় ভোগেন। কিন্তু কাজের ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা আসলে সৃজনশীল মানুষদের কাজ নয়। তার কাজ হচ্ছে নিজের কাজ করে যাওয়া। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার সেটি হলো মানুষের অনুপ্রেরণা তার চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারলে তা অসাধারণ ও অলৌকিক হয়ে উঠতে পারে। তার আবেগকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এজন্য সাফল্য ও মেধার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি না করে মানুষকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। তবেই পৃথিবী ও বদলে যাওয়া মানুষের ইতিহাস আমরা গড়তে পারবো।
n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
