বর্তমান খবরের কাগজ খুললে শুধু একটাই খবর, তা হলো করোনা ভাইরাস। যার কোনো সমাধান বের করতে পারছেন না দেশের বিজ্ঞানীরা। এই ভাইরাস মহামারির রূপ ধারণ করেছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এর মোকাবিলায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কেউই বুঝতে পারছে না এর শেষ কোথায়। পঙ্গপালের মতো মানুষ মরছে, ভয়াবহ অবস্থা, আর প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবনের ওপর। স্কুল-কলেজ বন্ধ, অফিস আদালত বন্ধ, নিত্য চলাফেরায় এসেছে নিষেধাজ্ঞা। জীবনঘাতী এই ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণ যেন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন হুমকির মুখে, এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী জনশূন্য হতে সময় লাগবে না।
ব্রিটেনের করোনা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। সরকারের নিয়মনীতি মেনে চললে আর জনগণ যদি সচেতন হয়, তাহলে নিরাময় না হলেও নতুন করে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। লকডাউন লন্ডনের রূপ একেবারে অন্যরকম, থমথমে পরিবেশ। লোকশূন্য রাস্তাঘাট। আতঙ্কিত চারপাশ। যুক্তরাজ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজার ৭১২, মৃত ৫৭৮, শুধু সুস্থ হয়েছেন ১৩৫ জন।
এদেশে সরকার জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভাইরাসের যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখা হয়েছে, যারা কাজে যেতে পারছে না এবং সেলফ এমপ্লয়িদের সরকার আর্থিক সহযোগিতা দান করবে। তাছাড়া বাড়িভাড়া, গ্যাস, ইলেকট্রিক বিল, মর্টগেজ, ব্যাংক লোন আপত্কালীন সময়ের জন্য মওকুফ করেছে। ব্রিটেনের আপামর জনগোষ্ঠী করোনা প্রতিরোধক নিয়মনীতি মেনে কোয়ারেন্টাইনে, হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে সরকারকে সহযোগিতা করছে। জীবনঘাতী ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এনএইচএস কর্মী, ডাক্তার, নার্স রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন, তাছাড়া কোভিড-১৯ দুর্যোগের মোকাবিলায় হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাসেবীতে নাম লিখিয়ে, মৃত্যু ভয় না করে জনগণের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। টেলিভিশন, নিউজ পেপার, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে করোনার প্রতি দিনের খবরাখবর, হুঁশিয়ারি ও কী কী করণীয় তা জনগণ ঘরে বসেই নিয়মিত জানতে পারছে।
সমগ্র বিশ্বে মরণ ভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। চীন থেকে শুরু হলেও এর শেষ যে কোথায় তা বিশেষজ্ঞরা কেউই বলতে পারছেন না। করোনা ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা জগত্ জয় করে মৃত্যুর লাল নিশান উড়িয়ে দিয়েছে। চীন, ইতালি, ফান্স, স্পেন, ইরানে তো মৃত নগরীতে পরিণত হয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ২৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৫ লাখ। যে হারে আক্রান্তের হার বেড়ে চলেছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে, আরো অনেক বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ে কোনো কার্যকরী ভ্যাকসিন বা মেডিসিন বের করতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। আশা করা যায়, খুব তাড়াতাড়ি এই বৈশ্বিক দুর্যোগের একটা ভালো উপায় বের করবে।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আর তা যদি প্রতিরোধ না করা হয়, তাহলে অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, কারণ বাড়তি জনসংখ্যা তাছাড়া চিকিত্সাসামগ্রী ও পর্যাপ্ত জায়গার অভাব এই রোগের প্রাদুর্ভাব ব্রিটেন আমেরিকা ও ইউরোপকেও মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। তারাও হিমশিম খাচ্ছে এর প্রতিরোধে। সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, একমাত্র কোনো সুপার শক্তি যদি রক্ষা করে তাহলেই দেশ বাঁচবে। বাংলাদেশ সংক্রমিত হওয়ার একমাত্র কারণ কিছু প্রবাসীর বাংলাদেশে ফিরে আসা। আর তারাই বহন করে এনেছে করোনা ভাইরাস। ২৬ মার্চ এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ জন। মারা গেছে পাঁচ জন। প্রতিবেশী দেশ ভারত বেশ উত্তেজিত; কারণ ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস।
কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস মানুষের জন্য একটা আতঙ্ক। প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীর সব দেশেই হয়, ভূমিকম্প, বন্যা, দাবানল, বিভিন্ন রকমের ভাইরাস মহামারি। অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটে থাকে। অপ্রতিরোধ্য হলেও একটা সময় থেমে যায়। আর বিভিন্ন ভাইরাসবাহিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। কিন্তু এই করোনা ভাইরাস সমস্ত পৃথিবীতে ছেয়ে গেছে, যা প্রতিরোধক বা প্রতিষেধক কোনোটাই নেই। মানুষ চেষ্টা চালাচ্ছে হয়তো খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধান বের করবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উন্নত হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু ব্যাপারে বিজ্ঞানও নিষ্ক্রিয়। যে ডাক্তার নার্স সেবা দিয়ে রোগী সুস্থ করে তোলে এই করোনা ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে অজস্র ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন। এই ভাইরাস প্রমাণ করছে প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায়। যদি এভাবে আরো কিছুদিন চলতে থাকে, প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন মেডিসিন আবিষ্কৃত না হয়—তাহলে পুরো দেশ হয়ে যাবে হাসপাতাল।
আমরা ডায়রিয়া হয়ে মৃত্যু দেখেছি, বসন্তে মৃত্যু দেখেছি। একটা সময় ছিল যে এলাকায় এই রোগগুলো হতো গ্রামের পর গ্রাম এর সংক্রমিত হতো। গ্রাম ছেড়ে মানুষ অন্যত্র চলে যেত। কিন্তু এই করোনা ভাইরাস থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। চলমান ভাইরাস পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাওয়া হউক না কেন সঙ্গে সঙ্গেই যাবে আর মানুষকে আতঙ্কিত, উত্কণ্ঠিত সর্বশেষ মৃত্যুর দোরগোড়ায় নিয়ে যাবে।
n লেখক :লন্ডন থেকে
