দেশের প্রতিটা সমস্যায় রাষ্ট্র যখন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে মোকাবিলার চেষ্টা করে; ঠিক তখনই প্রভাবশালী মহল বাজার কারসাজি, পণ্য মজুদ, গুজব তৈরিসহ নানা অপতত্পরতায় লিপ্ত হয়। এর সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তি এবং সরকারের ভেতরে-বাইরে ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীরা জড়িত। বারবার এইসব সিন্ডিকেটের কাছে আমরা দেশবাসী অসহায়ই থেকে যাই।
করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করেছে একশ্রেণির অসাধু ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করে যাচ্ছি; ঠিক সেই অবস্থায় যারা জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে ও মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিসহ নানাভাবে বাজার কারসাজি করে অধিক মুনাফা লাভের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, তারা কতটা অমানবিক—তা ভাবতেও অবাক লাগে। প্রশাসনকে তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে হবে। জেলা-উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে নজরদারি জোরদার করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজির সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালদের চিহ্নিত ও আইনের আওতায় আনতে না পারলে কোনোভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। দোকানে দোকানে যথাযথ মূল্যতালিকা নিশ্চিত, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি ও মজুদ বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত যাতে ‘গুরু দণ্ডে লঘু শাস্তি’ না দেন তার জন্য কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশ প্রদান জরুরি।
সরকারের বিশেষ বরাদ্দসহ বিদেশি সংস্থার অর্থায়ন যাতে নয়-ছয় না হয়, তার দেখভাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো জেলা লকডাউন-শাটডাউন করা হলে সে অঞ্চলের মানুষ যাতে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে। সে অঞ্চলে বাড়াতে হবে টিসিবি-র ভ্রাম্যমাণ পণ্যসেবা। পাশাপাশি একটি বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে যে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পল্লি চিকিত্সক, ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানের লোকজন। কারণ সিংহভাগ মানুষ তাদের কাছেই প্রাথমিক চিকিত্সা বা ওষুধের জন্য যান। প্রেসার ও ডায়াবেটিস মাপতে যান। কে কোন ভাইরাস নিয়ে পল্লি চিকিত্সক বা ওষুধের দোকানগুলোতে যাচ্ছেন, তা তাঁরা না ভেবেই বিশাল জনগোষ্ঠী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
বিত্তশালীদের উদ্যোগে ‘করোনা মোকাবেলা তহবিল’ গঠন করাটা জরুরি। এর মাধ্যমে ঘরে বসা থাকা ও নিম্ন আয়ের মানুষদের খাদ্য ও চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কিন্তু সে লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি। এই মুহূর্তে ব্যাংক-বিমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের উচিত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও দেশবাসীর সুরক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ সহায়তা করা। গার্মেন্টস মালিকরা প্রচুর পরিমাণে মাস্ক ও গ্লাভস এবং চিকিত্সা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পোশাক তৈরির উদ্যোগ নিতে পারেন; যা বিনামূল্যে হাসপাতাল ও আইসোলেশন সেন্টারসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রতিরোধক পণ্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে বিতরণ করতে পারে। ওষুধ কোম্পানির মাঠপর্যায়ের সকল প্রতিনিধি ও ফার্মাসিস্টদের এ কাজে নিযুক্ত করা কর্তব্য। কসমেটিকস কোম্পানি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার তথা সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, টিস্যু বিনামূল্যে বিতরণ করতে পারে। কোম্পানির মালিকদের উচিত নিজেদের কর্মীরা যাতে শতভাগ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় থাকে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে—ব্যবসা পরেও করা যাবে, আগে দেশ বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক।
জামালপুর
