বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যায় এখন শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে প্রায় ৮৬ হাজারের বেশি লোক আক্রান্ত হয়েছেন। নিউ ইয়র্ক এবং নিউ অরলিন্সের মতো শহরের হাসপাতালগুলো আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এদিকে বিশ্বে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি ‘সেলফ আইসোলেশন’ এ আছেন। আক্রান্ত হয়েছেন তার স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। খবর:বিবিসি, সিএনএন ও আলজাজিরার।
বিশ্বে নতুন করোনা ভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে। গতকাল রাত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৫টি দেশ ও অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের। আর সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ সাড়ে ২৭ হাজার জন।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে চীনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম শুরু হলেও এখন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তা লাখ ছাড়াতে সময় লেগেছিল ৬৭ দিন। রোগীর সংখ্যা ২ লাখে যেতে সময় লেগেছে ১১ দিন। এরপর চার দিনেই রোগীর সংখ্যা ২ লাখ থেকে ৩ লাখে পৌঁছে। এখন চার দিনে রোগীর সংখ্যা ৪ লাখের গণ্ডি ছাড়িয়ে ৫ লাখও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাত্ প্রতি দুই দিনে ১ লাখ আক্রান্ত হচ্ছে।
চীনের পর প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া এবং এরপর ইতালিতে মৃতের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। কোরিয়া পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলেও ইউরোপ বিপর্যস্ত হওয়ার পর এখন পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬ হাজার ১২ জন আর মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনের। এর মধ্যে বৃহস্পতিবারই মৃত্যু হয়েছে ২৩৩ জনের। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নিউ ইয়র্কের। সেখানে বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয়েছে ১০০-র বেশি মানুষের। নিউ ইয়র্ক শহরের ডাক্তাররা জানিয়েছেন, শেষ তিন দিনে ভেন্টিলেটরে রাখা রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টে এখন পর্যন্ত ২৫ নাবিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে পেন্টাগন জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যাপকহারে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স জানান, দেশটির ৫০টি রাজ্যেই এখন করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। ৫ লাখ ৫২ হাজারের বেশি পরীক্ষা করা হয়েছে। এ সময় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে বেইজিংয়ের প্রকাশিত তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রাতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন। এরপর তিনি টুইটে জানান, করোনা মোকাবিলায় দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ৩৩ লাখ মার্কিন নাগরিক চাকরি হারিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে গতকাল করোনা মোকাবিলায় দুই দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজের বিল পাশ হয়েছে। এর আগে বুধবার সিনেটেও পাশ হয় বিলটি।
এদিকে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৮১ হাজার মার্কিনির মৃত্যু হতে পারে। আগামী চার মাসে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। ওয়াশিংটন স্কুল অব মেডিসিনের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের ঐ গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, মহামারির চূড়ান্ত পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ২ হাজার ৩০০ মানুষ মারা যেতে পারে। এটি এপ্রিলের যেকোনো সময় হতে পারে।
আক্রান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন
মাত্র দুই দিন আগেই ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ও তার স্ত্রী ক্যামিলা এখন ব্যালমোরাল প্রাসাদে স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে আছেন। এর মধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এখন সেলফ আইসোলেশনে আছেন। লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জনসনের দেহে জ্বর এবং কাশিসহ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ‘মৃদু উপসর্গ’ দেখা গেছে। তিনি ডাউনিং স্ট্রিটেই আইসোলেশনে থাকবেন। তবে করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলায় ব্রিটেনের সরকারের প্রয়াসের নেতৃত্ব তিনিই দেবেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বরিস জনসন দায়িত্ব পালনে অক্ষম হবার মতো অসুস্থ হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক র?্যাব দায়িত্ব পালন করবেন।
ব্রিটেনে ১৪ হাজার ৫৭৯ আক্রান্তের মধ্যে মারা গেছে ৭৫৯ জন।
ব্রিটেনে ১৪ হাজার ৫৭৯ আক্রান্তের মধ্যে মারা গেছে ৭৫৯ জন। ব্রিটেনের যেসব বিজ্ঞানী করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন তারা হুঁশিয়ার করে বলছেন, লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে হলে বিশ্বকে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্বের অন্য অংশের যে পরিস্থিতি
চীনে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ৮১ হাজার ৮৯৭ এবং মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ১৭৪ জনের। নতুন করে সংক্রমণ এড়াতে দেশটি বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যাদের ভিসা কিংবা বসবাসের অনুমতি আছে তাদের ক্ষেত্রেও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ৫৮৯ জন। দেশটিতে সর্বশেষ একদিনে ৯৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে লম্বার্ডেতেই মারা গেছে ৫১৪ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে ৯ হাজার ১৩৪ জনের। এরপর স্পেনে সর্বশেষ একদিনে মৃত্যু ৭৬৯ জন বেড়ে ৪ হাজার ৮৫৮ জনে পৌঁছেছে। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪ হাজার ৫৯ জন। ইরানে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৩৭৮ জনের। আর আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ হাজার ৩৩২ জন। ফ্রান্সে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৬৯৬ জনের আর আক্রান্ত ২৯ হাজার ৫৮১ জন। প্যারিসে জুলি নামে ১৬ বছরের এক কিশোরীর মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
জার্মানিতে আক্রান্ত ৪৭ হাজার ৩৭৩ জন হলেও দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কোভিড-১৯ রোগী ধরা পড়েছে পাকিস্তানে ১ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৯ জন। ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে কম (৭২৪) হলেও মারা গেছে ১৭ জন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি রুপির বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। শুক্রবার আরবিআই গভর্নর শক্তিকান্ত দাস ৭৫ বেসিস পয়েন্ট রেপো রেট কমানোর কথা ঘোষণা করেন। যেসব কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেশি সেখান থেকে বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে ভারত।
