গোটা পৃথিবী এখন এক নূতন সংকটে। একই সময়ে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে এইরূপ কোনো সংকট আধুনিককালে তো বটেই, ইতিহাসের কোনো সময় দেখা যায় নাই। সাম্প্রতিককালে আমরা দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকায় জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখিয়াছি। প্রায় একই সময়ে, অর্থাত্ ২০১৪ হইতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণ দেখিয়াছি। ২০০৯-২০১০ সালে বিশ্বের বহু দেশে সোয়াইন ফ্লু দেখা দিয়াছিল। উহা মারাত্মক প্রাণঘাতী এবং বহু মানুষের প্রাণনাশ হইলেও সকল দেশকে আক্রান্ত করিতে পারে নাই। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে এইডস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও তাহা ছিল বিশেষ করিয়া আফ্রিকার দেশগুলিতে সীমাবদ্ধ। বাহিরের দেশগুলিতে রোগী থাকিলেও তাহা ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়ে নাই। পোলিও, প্লেগ, ফ্লুসহ ইতিহাসের অন্যান্য মহামারি বিভিন্ন শতকে যাহা আসিয়াছে, তাহাও ছিল অঞ্চলভিত্তিক; কিন্তু করোনার মতো এইরূপ বিশ্বব্যাপী কোনো ভাইরাসই আতঙ্কিত করিতে পারে নাই। ইহার প্রথম কারণ, এই ভাইরাস দ্রুত ছড়াইয়া পরিবার ক্ষমতা রাখে এবং ইহার চরিত্র এবং শুশ্রূষা সম্পর্কে কোনো দেশ, কোনো আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীর এখনো কিছু জানা নাই। দ্বিতীয়ত, ইহা অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবান যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশকে নাস্তানাবুদ করিয়া ফেলিতেছে। স্বভাবতই উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত—সকল ধরনের দেশই আতঙ্কিত হইয়া পড়িয়াছে।
এহেন পরিস্থিতিতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বুঝিতে পারিয়াছেন, সকল জাতি, বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—সবাইকে একত্রে মিলিয়া এই কমন শত্রুর মোকাবিলা করিতে হইবে। সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে একত্রে কাজ করিবার জন্য আহ্বান জানাইয়াছেন। সেই মোতাবেক এবং গভীর বিপদ উপলব্ধি করিয়া বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ সাময়িকভাবে হইলেও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করিয়াছেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝিয়া উঠে নাই, তখন সেই দেশের ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বিলে আপত্তি জানায়; কিন্তু পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—সকলে মিলিয়া ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিলে সম্মতি জ্ঞাপন করেন, যাহা শুক্রবার চূড়ান্তভাবে পাশ হয়। এই ভাইরাস সংক্রমণ হইতে শুরু করিলে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ইহা লইয়াও ঝগড়ায় জড়াইয়া পড়ে; কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি হইলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টকে টেলিফোন করেন এবং দুই দেশ করোনা মোকাবিলায় একত্রে কাজ করিবার আশা ব্যক্ত করেন। লক্ষ করা যাইতেছে, এক দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী অন্য দেশের কাউন্টার পার্টের প্রতি সহানুভূতি, সহযোগিতা ও ভরসার কথা জানাইতেছেন। দীর্ঘকাল পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে সার্কভুক্ত সকল দেশ ভিডিও কনফারেন্সে যোগদান করিয়াছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিতে দেখা যাইতেছে, সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে দূরত্ব কমিয়া গিয়াছে। সুতরাং উদ্ভ্রান্ত এই সময়ে মতাদর্শগত দূরত্ব কমাইয়া সকলে একত্রে কমন শত্রু করোনার বিরুদ্ধে কাজ করিবেন বলিয়া আমরা প্রত্যাশা রাখি। অবশ্য সেই মানসিকতা আমরা খানিকটা হইলেও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দেখিতে পাইতেছি। উহা অব্যাহত রাখিয়া, আরো ঘনিষ্ঠ, আরো খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করতঃ এই প্রাণঘাতী আক্রমণ রুখিয়া দিতে হইবে।
