প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়া চিন্তা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২০, ২২:০৬

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যাহাতে ছড়াইয়া না পড়ে, তাহার জন্য বাংলাদেশের জনগণকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখিতে দীর্ঘ ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করিয়াছে সরকার। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহত্; কিন্তু ইহার সুদূরপ্রসারি ফলাফল কতটা ভালো হইবে, তাহা এখনো স্পষ্ট নহে। কারণ ছুটি পাইয়া ঈদের সময়ের মতো পিলপিল করিয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ গত মঙ্গল ও বুধবার ঢাকা ছাড়িয়াছে। ফিরিয়াছে নিজ নিজ গ্রামে। তাহা ছাড়া ইতোমধ্যে ইউরোপ হইতে যাহারা দেশে আসিয়াছেন, তাহাদের বড়ো একটি অংশ ছড়াইয়া পড়িয়াছেন দেশের নানান প্রান্তে। বাড়িতে ফেরা এই সকল মানুষের বড়ো একটি অংশ নিয়মিত ভিড় করিতেছেন স্থানীয় বাজারে, চায়ের দোকানে। অনেকেই আবার দল বাঁধিয়া নামিয়াছেন ফুটবল ও ক্রিকেট খেলিতে। ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরা এই মর্মে দেশের নানান প্রান্তের চিত্র পাঠাইয়াছেন, যাহা প্রকাশিত হইয়াছে শনিবারের ইত্তেফাকে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সরকার ঘোষিত এই ছুটির সময়টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মানুষ সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করিয়া এখনো যত্রতত্র ভিড় করিতেছে। অথচ করোনা ভাইরাস ঠেকাইবার প্রধান অবলম্বন হইতেছে প্রত্যেক মানুষকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন রাখা, যাহাতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হইতে অন্যদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ না ঘটে। মনে রাখিতে হইবে, কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের বড়ো একটি অংশের মধ্যে ইহার উপসর্গ সুপ্ত থাকে। আবার শরীরে জীবাণু প্রবেশের পর রোগটি দেখা দিতেও সময় লাগে গড়ে ৪ হইতে ১৪ দিন; কিন্তু এই সময়ই ভাইরাসটি অলক্ষে ঐ আক্রান্তের শরীর হইতে অন্যদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে সবচাইতে বেশি। এই জন্যই এই ভাইরাস এমন দাবানলের মতো ছড়াইয়া পড়িবার ক্ষমতা রাখে, যাহার চিত্র আমরা দেখিতে পাইতেছি ইউরোপ-আমেরিকায়।

এইদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাইরাস জনবহুল এলাকাগুলিতে আগ্রাসীভাবে ছড়াইয়া পড়িবার ব্যাপারে। অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ বলিতেছে, যে কোনো মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হইতে পারে। এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত অপর্যাপ্ত বিধায় উদ্বেগ আরো বেশি। এই অঞ্চলে করোনা শনাক্তে পরীক্ষার হার কম থাকিবার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ধারণা করিতেছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চাইতে অনেক বেশি। এই ধরনের পর্যবেক্ষণের মধ্যে আমরা অশনিসংকেত খুঁজিয়া পাইতেছি। বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলের বাসিন্দা, দিনমজুর, বাস্তুচ্যুত মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী, কারাবন্দিসহ করোনা সংক্রমণে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠীগুলিকে রক্ষা করিতে আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নাই। সরকার সাধ্যমতো কাজ করিতেছে। সাধারণ জনগণকেও সর্বাগ্রে সচেতন হইতে হইবে। ইতালিসহ বিভিন্ন উপদ্রুত দেশ হইতে আগত প্রবাসীদের ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা রহিয়াছে ১৪ দিন বাধ্যতামূলকভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা; কিন্তু নির্দেশনা মানিতেছেন না অনেকেই। ইহার ভয়াবহ দিক অনুধাবন করিতে পারিতেছেন না তাহারা। তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, একবার গোষ্ঠী সংক্রমণ ছড়াইয়া পড়িলে এই দাবানল আর সহজে প্রতিহত করা যাইবে না।