করোনা ভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে তরল দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ডেইরি খামারি ও প্রান্তিক দুধ বিক্রেতারা। কমে গেছে দুধের চাহিদা। যেসব প্রতিষ্ঠানে খামারিরা দৈনিক দুধ সরবরাহ দিতেন তারা এখন দুধ কিনছে না। এ অবস্থায় বাসা-বাড়িতে সীমিত পরিমাণ দুধ লোকসানে বিক্রি করা গেলেও প্রচুর দুধ ফেলে দিতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে অবস্থিত মিল্ক ভিটা ফ্যাক্টরি খামারিদের কাছ থেকে তরল দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে চট্টগ্রামের হাজারো ডেইরি খামারি ও প্রান্তিক দুধ বিক্রেতা।
কাঁচা তরল দুধ নিয়ে মহা সমস্যায় পড়েছেন দুগ্ধ খামারিরা। কাঁচা দুধ ৪/৫ ঘণ্টার বেশি রাখা যায় না। দুধ সংরক্ষণের জন্য তাদের নিজস্ব কোনো প্ল্যান্টও নেই। মিষ্টির দোকান ও বেকারিগুলোও দুধ কিনছে না। তারা দুগ্ধজাত পণ্যের উত্পাদন কমিয়ে দিয়েছে। এতে কারখানায় তরল দুধের চাহিদা কমে যাওয়ায় দুধ বিক্রি হচ্ছে না। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় দুধ পরিবহন করা যাচ্ছে না। ফলে লাখ লাখ লিটার তরল দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। প্রচুর দুধ ফেলে দেওয়া হচ্ছে খালে।
চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা, পটিয়া ও আনোয়ারা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেইরি খামার রয়েছে। কেবল শিকলবাহা এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ৫০০ ডেইরি খামার। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুণ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আমার খামারে ৩৬টি গাভি গরু রয়েছে। প্রতিদিন চট্টগ্রামের মিল্ক ভিটা ফ্যাক্টরিতে দুধ সরবরাহ দিতাম। গত বৃহস্পতিবার থেকে মিল্ক ভিটা তরল দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এলাকার খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। আমার দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। খামারের গরুর খাবারের পেছনে দৈনিক প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে। অবিক্রিত দুধ খালে ফেলে দিচ্ছি। তরল দুধ সংরক্ষণের মতো আমাদের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা নেই।’
চট্টগ্রামের শিকলবাহায় মিল্কভিটার দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে। তাদের দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার লিটার দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে তারা দৈনিক ৭/৮ হাজার লিটারের বেশি দুধ সংগ্রহ করে না। সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা দুধ পরে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ডা. বাবুল আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয়ভাবে দুধ সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংগ্রহ করা দুধ ঢাকায় পাঠাতে হয়। এখন পরিবহন সংকটে পাঠানো যাচ্ছে না। তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় আমাদের নির্দিষ্ট ক্রেতারাও দুধ কিনছে না। সংগ্রহ করা তরল দুধ প্রক্রিয়াজাত করে আমরা ২/৩ দিন রাখতে পারি।’
চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র জানায়, তাদের রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত ৪৫০টি ডেইরি ফার্ম রয়েছে। তার বাইরেও বিভিন্ন উপজেলায় অনেকেই নিজস্ব উদ্যোগে ২/৩টি করে দুধের গাভি পালন করে থাকেন। এ ধরনের হাজারো কৃষক পরিবার রয়েছে। এসব কৃষক পরিবার দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এখন দুধ বিক্রি না হওয়ায় তারাও আর্থিক সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিজওয়ানুল হক ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে সব মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ উত্পাদন হয়। তবে এ জেলায় বছরে দুধের চাহিদা তার চেয়ে বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অন্যান্য সেক্টরের মতো এই খাতেও বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমরা চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে দুধ পরিবহনে কোনো সমস্যা হবে না বলে খামারিদের নিশ্চিত করেছি। আমাদের সাময়িক সমস্যা অচিরেই কেটে যাবে।’
