এখনো বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জনরার বিভাজন খুব একটা পরিচিত বিষয় নয়। মূলধারার সিনেমাগুলোকে হয় সামাজিক-অ্যাকশন নয়তো রোম্যান্টিক-অ্যাকশন বলে চালিয়ে দেয়া হয়। আর এর বাইরের সব সিনেমাকেই বলা হয় ‘আর্ট ফিল্ম’। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের জন্য পৃথক সংজ্ঞার কথা তো ভাবাই যায় না।
ওয়ার ফিল্মের সংজ্ঞার আলোকে এভাবে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে—মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, কার্যকারণ, প্রতিরোধ, মুক্তিযুদ্ধ সংঘটন ও পরিচালনা, মুক্তিযুদ্ধকালীন দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা ইত্যাদি যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে (বর্তমান) বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং সৈন্য তথা মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা নিয়ে যেসব চলচ্চিত্রের আখ্যান আবর্তিত হয়, সেগুলোকেই মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলা হবে।
এখন বাস্তবতা হলো, যেখানে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাই প্রচলিত নয়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকাটাই স্বাভাবিক। সে কারণেই বোধহয় সবার ধারণা দেশে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার সংখ্যা হাতেগোনা। চিত্রটা আসলে তার বিপরীত। এ পর্যন্ত অন্তত কয়েক শ মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। অবশ্য অনেকেই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রকে গোনার মধ্যেই ধরতে চান না। সেগুলোকে বাদ দিলেও সংখ্যাটা শ খানেকের কাছাকাছিই হবে।
ইদানীং চলচ্চিত্রের অবস্থা এতই করুণ হয়েছে যে, বছরের সবচেয়ে সফল বা আলোচিত সিনেমার কথাও আমজনতার কান অবধি ঠিকঠাক পৌঁছায় না। এদিকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ। তার মধ্যে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের সংখ্যা বেশি হলেও, পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। সেগুলো ভালো না খারাপ সেটা অন্য বিতর্ক। তারও পূর্বের সমস্যা হলো, চলচ্চিত্রের দুরবস্থার কারণে এই সিনেমাগুলোর খবর সাধারণ মানুষ জানতেই পারছে না।
তার ওপর ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আমাদের সিনেমা সে অর্থে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেনি। গোড়ার দিকের চলচ্চিত্রগুলোর গল্প ছিল দুর্দান্ত। মূল অন্তরায় ছিল কারিগরি জ্ঞানের স্বল্পতা। তারপর যত দিন গেছে কারিগরি জ্ঞানের স্বল্পতা তো মেটেইনি, উপরন্তু গল্পের ক্ষেত্রেও আমরা হেঁটেছি উলটো পথে। এহেন সক্ষমতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল ও মহান ক্যানভাসকে সেলুলয়েডে ধারণ করতে গেলে হিতে বিপরীত না হওয়াটাই কঠিন। তাও যে কেউ কেউ খানিকটা সফল হয়েছেন, সেজন্যই তাঁরা নমস্য।
মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের নির্মাতারা পৌঁছাতে পারছেন না দর্শক অবধি। তাঁদের সিনেমা আটকে থাকছে ‘পরিচিত পরিমণ্ডল’-এর আবর্তে। আবার দর্শকরাও জানতে পারছেন না নিজের দেশের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের খবর। যদিও একটু মনোযোগী দর্শককে জিজ্ঞেস করলেই দেখা যাবে তিনি দুই বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই, আরো বহু যুদ্ধের ওপর বহু দেশের চলচ্চিত্র ভুরিভুরি দেখেছেন।
