ফটোগ্রাফিক মেমোরির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তুখোড় স্মৃতিশক্তি ছিল তাঁর। একবার যাকে দেখতেন বা যার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হতো, সহজে ভুলতেন না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেকেই দেখা করতে আসে। তো একবার গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য এক বৃদ্ধ এলেন। মুখভরা পাকা দাড়ি। হতদরিদ্র পোশাক পরণে। গণভবনের কর্মীরা বৃদ্ধ লোকটিকে কিছু টাকা ও কাপড়-চোপড় দিলেন। আর জানিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুর এখন সাক্ষাত্ দেওয়ার সময় নেই। তিনি খুব ব্যস্ত।
কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি জানালেন তিনি কোনো সাহায্য চান না। কোনো সাহায্য নেওয়ার জন্যও তিনি আসেননি। এসেছেন কেবল বঙ্গবন্ধুকে একটিবার দেখার জন্য। একবার দেখেই চলে যাবেন।
বৃদ্ধের নাম-ঠিকানা জানতে চাইলেন বঙ্গভবনের কর্মীরা। বৃদ্ধ সেটাও বলতে নারাজ। তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়া চাই-ই চাই। শেষ পর্যন্ত এমন নাছোড়বান্দা বৃদ্ধের কথা বঙ্গবন্ধুকে জানানো হলো।
জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকলেও বঙ্গবন্ধু হাতের কাগজপত্র এক পাশে রেখে বললেন, ‘আচ্ছা ভিতরে নিয়ে এসো।’
গণভবনের ভিতরে এলেন বৃদ্ধ। বঙ্গবন্ধু যে ঘরটায় বসা ছিলেন, সে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিলেন। কিন্তু ঘরের ভিতরে ঢুকলেন না। বরং বঙ্গবন্ধুর দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। বঙ্গবন্ধু চুপ। কেউ কোনো কথা বলছেন না। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধই কথা বলে উঠলেন, ‘আমারে কি চিনবার পারছেন বাবা? বহুদূর থেকে আপনারে একটু দেখবার আইছি।’
চেয়ারে বসা বঙ্গবন্ধু বুড়োর দিকে অপলক তাকিয়ে পাইপ টেনে চলেছেন। পাইপ টানতে টানতে চুপ করে কিছু একটা ভাবছেন বলে মনে হলো।
উপস্থিত সবাই কিন্তু বিব্রতবোধ করতে লাগল। বঙ্গবন্ধুকে এ কী ধরনের চ্যালেঞ্জ জানালেন বৃদ্ধ! এর আগে কেউ এরকম চ্যালেঞ্জ জানায়নি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। পিনপতন নীরবতা গণভবনের সে ঘরে। হঠাত্ নীরবতা ভেঙে বঙ্গবন্ধুর গুরুগম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, ‘হ্যাঁ চিনেছি। চুয়ান্ন সনে যুক্তফ্রন্টের ইলেকশন মিটিং করার সময় বরিশালে নৌকায় পার হয়েছিলাম। আপনি সেই নৌকার মাঝি না?’
‘আমাকে চিনতে পেরেছেন!‘ বলেই আবেগে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন বৃদ্ধ। ঝরঝর করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে ফেললেন। এটা দেখে আর বসে থাকতে পারলেন না বঙ্গবন্ধু। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বৃদ্ধকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বুড়োও জড়িয়ে ধরলেন বঙ্গবন্ধুকে। অনেকক্ষণ।
বঙ্গবন্ধু এবার বৃদ্ধের কাছে জানতে চাইলেন তাঁর কিছু দরকার কি না। কিন্তু বৃদ্ধ সে কথার কোনো জবাব দিলেন না। বঙ্গবন্ধু এবার বৃদ্ধকে নিজেই গণভবনের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। উপহারও দিতে চাইলেন। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটিকে কিছুই দেওয়া গেল না। কারণ তিনি এর মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড়ো উপহার পেয়ে গেছেন। দীর্ঘ বিশ বছর পর ক্ষণিকের দেখা, তাঁর মতো সামান্য এক নৌকার মাঝিকেও বঙ্গবন্ধু মনে রেখেছেন, এর চেয়ে বড়ো উপহার আর কী হতে পারে!
