করোনার পরীক্ষা ও স্বাভাবিক চিকিত্সাব্যবস্থা

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২০, ২১:১৩

জগতের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সমরনীতি, চিকিত্সানীতি—সকল জায়গা দখল করিয়া লইয়াছে করোনা ভাইরাস। বিশ্ব যেহেতু এখন বিশ্বগ্রামে পরিণত হইয়াছে, সেই কারণে করোনা-সৃষ্ট যাবতীয় ঢেউ আঘাত হানিতেছে বাংলাদেশেও। করোনা চিকিত্সায় বাংলাদেশ সরকার এখন যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি লইতেছে; কিন্তু মুশকিল হইল, করোনা ছাড়াও অসংখ্য সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগব্যাধি রহিয়াছে, যাহার চিকিত্সাসেবা দেওয়া হয় সাধারণ হাসপাতালগুলিতে; কিন্তু করোনার ছায়া এতটাই লম্বা যে, উহা গ্রাস করিতেছে অন্যান্য রোগের চিকিত্সাব্যবস্থাতেও। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি জটিলতা দেখা দিয়াছে সাধারণ সর্দি-জ্বর, কাশির চিকিত্সায়। করোনার সহিত বহুলাংশে সাদৃশ্য থাকায় সাধারণ মানুষ বুঝিতে পারিতেছেন না করোনা ও সর্দি-জ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জার পার্থক্য। ফলে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত মাত্রই করোনার আশঙ্কা করিতেছেন বেশির ভাগ মানুষ। অথচ চিকিত্সকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের এই সময় গলাব্যথা, সর্দি-কাশি খুব সাধারণ ব্যাপার।

কথায় আছে, অন্ধকার ঘরে মনে হয় সাপ যেন ছড়াইয়া রহিয়াছে সারা ঘরেই। করোনাও তেমনি ঢুকিয়া গিয়াছে আমাদের মনোজগতে। করোনার এই কালবেলায় বিভিন্ন রোগের জটিল পর্যায়ের নিয়মমাফিক চিকিত্সাপ্রার্থীরা অনেক হাসপাতালেই কিছুটা অবহেলারও শিকার হইতেছে। আবার অন্যান্য সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগীদের অনেকেই হাসপাতালে চিকিত্সা লইতে দ্বিধা করিতেছেন। বিশেষ করিয়া, যেই সকল হাসপাতালে করোনা সন্দেহে কাহারো চিকিত্সা হইতেছে, সেই সকল হাসপাতালকে ভয় পাইতেছে অন্য সকল রোগের চিকিত্সাপ্রার্থীরা। অন্যদিকে, সাধারণ সর্দি-জ্বর বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরিয়াও পাইতেছেন না চিকিত্সা। ঢাকা এবং ঢাকার বাহিরে সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালেই একই পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা তাহাদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও বসিতেছেন না। কিছু হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের ভর্তিই নেওয়া হইতেছে না। আবার এমনও দেখা গিয়াছে যে, করোনা ভাইরাসে শনাক্ত হইবার কথা ঘোষণা করা না হইলেও বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে চিকিত্সাধীন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে। তাহাদের যে করোনা হইয়াছে, এমনও নহে। এমন চিত্র দেখা গিয়াছে খুলনা, বরিশাল, মানিকগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে। এমন খবর দেশ জুড়িয়া অনেক রহিয়াছে।

এই অবস্থায় দুইটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি হইল—যত বেশি সম্ভব করোনা উপসর্গযুক্ত রোগীদের করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। আর দ্বিতীয়টি হইল—অন্যন্য সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের নিয়মমাফিক চিকিত্সায় যাহাতে ব্যাঘাত না ঘটে, তাহার ব্যবস্থা করা। মনে রাখিতে হইবে, সারা বত্সর যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হেপাটাইটিস, কিডনি, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হূদেরাগে আক্রান্ত হইয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশে এমনিতেই মৃত্যুবরণ করেন। চিকিত্সার মাধ্যমে অনেকে সুস্থও হইয়া উঠেন। সুতরাং এই সকল রোগের চিকিত্সা-সংকট দেখা দিলে তাহা বৃহত্তর ক্ষতি ডাকিয়া আনিবে। আর, করোনার ক্ষেত্রে আমরা যত বেশি এবং দ্রুত পরীক্ষা করিতে পারিব তত বেশি সংশয় দূর হইবে। এই ক্ষেত্রে করোনা পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর সবচাইতে বেশি জোর দিতে হইবে। আর সকলকে মানিয়া চলিতে হইবে যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি। করোনা-সংকট একসময় কাটিবে নিশ্চয়ই।