পৃথিবীতে ভাইরাস সংক্রমণ প্রবল হচ্ছে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২০, ২১:১৯

শাকিল আহমেদ

২০১২ সালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্স, ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা, ২০১৫ সালে ল্যাটিন আমেরিকায় জিকা ভাইরাস এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে চীনে করোনা ভাইরাসের আক্রমণই জানান দেয় পৃথিবীতে মহামারির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মহামারিগুলোর ব্যাপ্তি পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে বিরাজ করলেও, করোনা সংক্রমণ ছড়িয়েছে পৃথিবীব্যাপী। যার উত্পত্তিস্থল ছিল চীনের উহান প্রদেশ। ২০০৩ সালের সার্স এবং ২০১২ সালের মার্স এই রোগ দুটির প্রাদুর্ভাব করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমেই হয়েছিল। কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের একটি নতুন প্রজাতি যা মানবদেহে প্রথম ধরা পড়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। করোনা ভাইরাস পোকামাকড়, পশুপাখি থেকে মানবদেহে ছড়ায়। চীনে সার্স করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছিল খট্টাশ বা ভামের মাধ্যমে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্স করোনা ভাইরাসটি মানবদেহে ছড়ায় উটের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন কোভিড-১৯ বাদুড় হতে ছড়াতে পারে, যদিও এর নিশ্চিত সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি আক্রান্ত মানবদেহে পাওয়া করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্লেষণ করে উহান ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলোজি জানিয়েছে, কোভিড-১৯ ও বাদুড়ের দেহে পাওয়া করোনা ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ৯৬% মিল রয়েছে।

গত ৬০ বছরে প্রতি দশকে নতুন রোগের আবির্ভাব ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১০০ বছর আগে সংক্রমণজনিত কারণে মানুষ যতটা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ছিল তার থেকে অনেক গুণ বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে বর্তমান যুগের মানুষ। কারণ বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা পূর্বের তুলনায় বেশি। গত ৫০ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে মানুষের সংক্রমণের হার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি তা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও বেড়েছে। বিশেষ করে যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মানুষ এক জায়গায় স্থির থাকে না। ভাইরাসে আক্রান্ত যে ব্যক্তিটি আজ আমেরিকা আছেন তিনি দুই দিনের ভেতর সেই ভাইরাসটি বহন করে এশিয়া, ইউরোপ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় অন্য একটি মানুষের সংস্পর্শে এসে তাকে সংক্রমিত করতে পারেন। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটেছে। অনেক সতর্কতার পরেও কোভিড-১৯ কে উহানে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি। এক লাখ মানুষকে আক্রান্ত করতে কোভিড-১৯ এর সময় লেগেছে তিন মাস। এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে সময় লেগেছে মাত্র ১২ দিন। বর্তমানে ভাইরাসটি পৃথিবীর প্রায় ১৯২টি দেশে ছড়িয়েছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা  ৫ লাখ অতিক্রম  করেছে।

বর্তমান আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের পক্ষেও নতুন মহামারি প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণেই নতুন রোগের আবির্ভাব হয়ে থাকে। ভাইরাসের গঠন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকসহ অন্য অণুজীবগুলো থেকে একদম আলাদা। অন্য অণুজীবগুলোর মতো ভাইরাসের কোনো নিউক্লিয়াস ও কোষপ্রাচীর নেই। মানবদেহের ভেতর সংঘটিত রাসায়নিক ক্রিয়া ব্যবহার করে মানবদেহের ভেতরই এরা বংশবিস্তার করতে থাকে। ভাইরাস ক্রমশ নিজেদের জিনোম সিকোয়েন্স এর পরিবর্তন করে অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। করোনা এখনো পর্যন্ত ৩৮০ বার জিন বদলেছে। এর ফলে পূর্বের আক্রমণকারী ভাইরাসের সঙ্গে পরিবর্তিত ভাইরাসের কোনো মিল থাকে না। তাই অধিকাংশ এন্টি ভাইরাল ওষুধ ভাইরাসজনিত নতুন রোগের চিকিত্সায় খুব একটা কার্যকর হয় না। ভাইরাস দমনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরি ভূমিকা পালন করে ভ্যাক্সিন। রোগ সৃষ্টিকারী মৃত বা দুর্বল ভাইরাস থেকে তৈরি ভ্যাক্সিন মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধে নির্দিষ্ট এন্টিবডি তৈরি করে। কিন্তু নতুন রোগের আবির্ভাবের শুরুতে সেটি প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন প্রস্তুত থাকে না। একটি ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করতে গড়ে দুই-পাঁচ বছর সময় লাগে। একটি ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করতে হলে প্রথমে মানবদেহে ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করতে হয়। এর জন্য প্রথমে একটি এনিমাল মডেল তৈরি করে এনিমাল মডেলে ঐ ভ্যাক্সিনটি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে পারে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা সফল হলে এরপর ভ্যাক্সিনটি হিউম্যান ট্রায়ালে পাঠানো হয়। হিউম্যান ট্রায়ালে ভ্যাক্সিনটি মানবদেহে নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের মাধ্যমে মানুষের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে মানুষের ওপর করোনা ভাইরাস ভ্যাক্সিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে আগামী ১৮ মাসের ভেতর করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা সম্ভব।

ভাইরাসজনিত কারণে বিভিন্ন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। এই সংকট মোকাবিলায় উন্নত গবেষণার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অতীব জরুরি, যাতে পরবর্তী ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা সক্ষম হই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়