করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত আরো এক জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ছয় জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো তিন জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। গতকাল বুধবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত মোট ২৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করছে। ইতিমধ্যে সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৫০০ ভেন্টিলেটর বসানোর কাজ চলছে। আমদানি পর্যায়ে রয়েছে আরো ৩০০ ভেন্টিলেটর। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রয়েছে ৭০০ ভেন্টিলেটর। ইতিমধ্যে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালকে (কোভিড-১৯ চিকিত্সার জন্য) প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে ভেন্টিলেটরও থাকবে। গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালকে প্রস্তুত করেছি, সেখানেও ভেন্টিলেটর থাকবে। বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে আগে থেকেই কাজ চলছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরো হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরের বাইরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদালয়, মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) ও শিশু হাসপতালে ‘টেস্টিং ফেসিলিটি’ চালু করা হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে ঢাকা মেডিক্যালেও চালু হয়ে যাবে। ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হবে। তিনি বলেন, শুধু টেস্টিং ফ্যাসিলিটি থাকলে চলবে না, জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। জনগণ এগিয়ে আসুক, টেস্ট করুক। আমি চাচ্ছি না কোনো লোক টেস্টের বাইরে থাক। যারা সন্দেহজনক অবস্থায় আছেন, তারা টেস্ট করুন, নিজেরা ভালো থাকুন এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন। বেশি বেশি টেস্ট করুন, নিজেকে সুরক্ষা করুন এবং সমাজকে নিরাপদে রাখুন।’
দেশে অনেক বেসরকারি হাসপাতালের ভালো চিকিত্সা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এখন সেই মাত্রায় সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ডাক্তাররা অনেকেই ভালো সেবা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের চেম্বারগুলো এখন বন্ধ রয়েছে বলে আমাদের কাছে খবর আসছে। হাসপাতালগুলোর চিকিত্সাব্যবস্থা একটু স্তিমিত হয়ে গেছে। আমি আশা করব আপনারা এগিয়ে আসবেন, দেশবাসীর পাশে থাকবেন।’
মৃদু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে
বিশ্ব জুড়ে মহামারি রূপ নেওয়া নভেল করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে সামাজিক পর্যায়ে সংক্রমিত হচ্ছে বলে স্বীকার করলেও তা মৃদু মাত্রায় রয়েছে বলে মনে করছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিইএইচ) ভাইরোলজিস্ট খন্দকার মাহবুবা জামিল এ তথ্য জানান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে, তবে মৃদু লেভেলে। কারণ যে পরিমাণ স্যাম্পল আসছে, তার তুলনায় করোনা ভাইরাস পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে খুবই কম। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যদি বেশি হতো, তাহলে সবগুলোতে আমরা পজিটিভ পেতে পারতাম।
আইসোলেশনে দুই জনের মৃত্যু
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এক জনের বয়স ৬৫ বছর, আরেক জনের ৩২। তারা করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে এখানে চিকিত্সাসেবা নিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার তারা হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের নতুন ভবনের নিচে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া আরেক জন বুধবার ভোর ৫টার দিকে মারা যান। মৃত দুই ব্যক্তি জ্বর ও ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি ছিলেন। তাদের দুই জনের মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। রক্তের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট এলেই তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। ভাইরাস পজিটিভ এলে যথাযথ পদ্ধতিতে দাফন করা হবে। আর নেগেটিভ এলে স্বজনদের কাছে দিয়ে দেওয়া হবে মরদেহ।
মৃত ব্যক্তির শরীরে চার ঘণ্টা পর্যন্ত ভাইরাসটি থাকতে পারে
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শরীরে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাইরাসটি থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবাণুবিদ ডা. খন্দকার মাহবুবা জামান। আইইডিসিআরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘ভাইরাসটা সাধারণত জীবিত মানুষ বা প্রাণীর মাধ্যে থাকে। মৃতদেহে ভাইরাস দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে কয় ঘণ্টা থাকতে পারে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। যখন কোনো মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহের দরকার হয়, তখন আমরা দুই থেকে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টার মধ্যে মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে থাকি। তবে ঐ ব্যক্তি যদি এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তার নমুনা নাকের মধ্যে থাকে। ঐ ভাইরাসটা মৃত হয়ে গেলেও তার নমুনা সংগ্রহ করে পিসিআর করে সেটা টেস্ট করা যায়।’
