এস এম আনওয়ারুল করীম
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে ভয়ানক মহামারি হচ্ছে করোনা ভাইরাস। দিনে দিনে এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও আশঙ্কাজনক হারে এতে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনে দিনে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। করোনা ভাইরাস মূলত বান্দাকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহর গজব। রাসুল (স) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৪০১৯)
বেশির ভাগ মহামারিই সংক্রামক। তাই রাসুলুল্লাহ (স) মহামারির সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিনদের ইমান ও আন্তরিকতার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। তিনি বলেন, মহামারি আল্লাহর গজব বা শাস্তি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। আবার কোনো এলাকায় দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি, হাদিস নং-১০৬৫)
এই হাদিসের আলোকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। সংগত কারণেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজার ব্যাপারে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় কেউ তার ছায়াও মাড়াতে ভয় পাচ্ছে। পরম আত্মীয়স্বজনও কাছে ঘেঁষতে পারছে না। অনেক লাশের ক্ষেত্রে এমন ঘটছে যে সংক্রমণের আশঙ্কায় গোসল বা জানাজা ছাড়াই লাশ দাফন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাকে গোসল দেওয়া, সম্মানজনকভাবে কাফন-দাফন করা এবং তার জানাজার নামাজ পড়া ফরজে কিফায়া। অর্থাত্, সমাজের একদল লোক তা আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় সবাই গুনাহগার হবে।
একদিকে যেমন মহামারি আল্লাহর গজব, অন্যদিকে তা বান্দাকে সতর্ক করার জন্য মহানিয়ামত। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স) বলেছেন, মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। (বুখারি, হাদিস নং-২৮৩০) এই হাদিসের আলোকে যেহেতু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তি শহিদের মর্যাদা পাবে, সেহেতু এমন ভাগ্যবান ব্যক্তির গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজা পড়ানোও সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আতঙ্কের কারণে এখন তা সঠিকভাবে করা যাচ্ছে না।
বর্তমান সময়ের ইসলামি চিন্তাবিদগণের মতামত হলো, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিকেও গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজার নামাজ আদায় করতে হবে এবং সম্মানজনকভাবে কবরস্থ করতে হবে। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। গোসলদাতার পূর্ণ শরীর ঢেকে নিতে হবে। তার নাকে-মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস পরে নিতে হবে। প্রয়োজনে দূর থেকে পানি স্প্রে করে হলেও গোসল দিতে হবে। তবে যদি সংক্রমণের প্রবল আশঙ্কা হয়, কোনোভাবেই গোসল দেওয়া সম্ভব না হয়, এমনকি পানি স্প্রে করাও সম্ভব না হয়; তাহলে মৃত ব্যক্তিকে তায়াম্মুম করিয়ে দেবে। এক্ষেত্রে গোসলদাতা তার গ্লাভস পরা দুই হাত মাটিতে মেরে মৃতের চেহারা ও তার দুই হাত মাসাহ করে দেবে। আর যদি করোনা বা ভয়াবহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিকে সর্বাত্মক চেষ্টা করার পরও গোসল কিংবা তায়াম্মুম করানো সম্ভব না হয়, তাহলে গোসল-তায়াম্মুম ছাড়াই জানাজা পড়িয়ে দাফন করে দিলে আশা করা যায় গুনাহ হবে না। কারণ কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না। (সুরা বাকারা, ২৮৬) অনত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্য মোতাবেক ভয় করো।’ (সুরা তাগাবুন, ১৬)
—লেখক : মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক
