যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম দিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তরা অবাধে ঘোরাফেরা ও মেলামেশা করে অন্যদের শরীরে যে গণহারে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা প্রমাণ হতে শুরু করেছে। লকডাউন কিংবা সামজিক দূরত্ব পালন সত্ত্বেও দেশটিতে এই রোগের প্রকাশ হতে শুরু করেছে ব্যাপক হারে। বৃহস্পতিবার দেশটিতে নতুন করে প্রায় ২১ হাজার লোকের শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে। এদিন সেদেশে মারা গেছে ৫০১ জন। এদের মধ্যে সবচে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নিউ ইয়র্কে (৮ হাজার ৪৮০ জন)। রাজ্যটিতে এদিন মারা গেছে ১৫৪ জন। নিউ জার্সিতে এদিন আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৩৫ জন এবং মারা গেছে ১৮২ জন।
আর প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে বিশ্ব জুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছুঁয়ে ফেলেছে। মারা গেছে ৫১ হাজারের বেশি। গতকাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ইউরোপের দেশ ইতালিতে। দেশটিতে গতকাল পর্যন্ত ১৩ হাজার ৯১৫ জন মারা গেছে, যার মধ্যে গতকাল মারা গেছে ৭৬০ জন। সেখানে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার। আর স্পেনে মারা গেছে ১০ হাজার ৯৬ জন। সেখানেও মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ইতালির সমান। বৃহস্পতিবার স্পেনে নতুন করে ৬ হাজার ১২০ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়েছে। স্পেনে গতকাল মারা গেছে ৭০৯ জন। আর যুক্তরাজ্যে এক দিনেই করোনা ধরা পড়েছে ৪ হাজার ২০০ জনের শরীরে এবং এক দিনে সেখানে মৃত্যু হয়েছে ৫৬৯ জনের।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে তাতে আগামী দিনগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে অল্প দিনের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আশঙ্কা প্রকাশ করেইে তিনি থেমে থাকেননি। তার প্রশাসন এরই মধ্যে নতুন করে ১ লাখ বডিব্যাগের অর্ডার দিয়েছে।
করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেলে দাফনের আগে তাকে এই বডিব্যাগে ঢুকাতে হয় যাতে জীবাণু বাইরে ছড়াতে না পারে। বডিব্যাগ ক্রয়ের এ আদেশ সংক্রান্ত ফাইলটি মার্কিন গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে। এতে দেখা যায়, ট্রাম্পের সই করা ঐ ফাইলে ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি বা ফেমা এই আদেশ জারি করেছে। ফাইলটি পরে প্রতিরক্ষা বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে, যে বিভাগ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নথিতে বলা হয়েছে পেন্টাগনের কাছে বর্তমানে ৯৪ ইঞ্চি বাই ৩৮ ইঞ্চি মাপের ৫০ হাজার বডিব্যাগ আছে। অর্থাত্ ১ লাখেরও বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা করছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেশটি।
ডিসেম্বরের শেষদিকে চীনের হুবেই থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী এ করোনা ভাইরাস বিশ্বের ১৮০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও স্পেনে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে নিউ অরলিয়ন্স ও ডেট্রয়টেও আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিসিসিপিতে নতুন করে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির ৭৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন লকডাউন বা ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন।
সংক্রমণ কমিয়ে আনতে লকডাউনের মতো কঠিন পদক্ষেপে গেলেও ইউরোপ ও আমেরিকার পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে তার কারণ শুরুর দিকে গুরুত্ব না দেওয়া। মানুষে মানুষে খোলামেলা মেলামেশার এসব দেশে প্রথম দিকে আক্রান্তরা ঘনিষ্ঠভাবে যাদের সঙ্গে মিশেছে তারা প্রত্যেকে আরো অনেকের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। নতুন করে আক্রান্তরা আরো অনেকের মধ্যে ছড়িয়েছে। এভাবে দেশগুলোতে জ্যামিতিক হারে বিস্তার লাভ করেছে কোভিড-১৯ ভাইরাস।
এদিকে, মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ তাদের ৩৬ হাজার কর্মীর চাকরি সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত করতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে কোম্পানিটি তাদের কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড স্টাফ, প্রকৌশলী ও সদর দপ্তরে কাজ করা কর্মীদের ৮০ শতাংশের চাকরি সাময়িক স্থগিতের কথা বলেছে। তবে কাউকে ছাঁটাই করা হবে না। স্থগিতের সময়ে কর্মীরা সরকারের দেওয়া তহবিল থেকে আংশিক বেতন পাবেন।
