যে কোনো হিসেবে মানুষ একটি বিস্ময়কর প্রজাতি। তাদের ছোটোখাটো আকার এবং তাদের মাথার ভেতর দেড় কেজি থেকেও কম একটা মস্তিষ্ক। সেই মস্তিষ্কটি ব্যবহার করেই এই মানুষ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বের করার দুঃসাহস দেখানোর ক্ষমতা রাখে। পদার্থের অণু, পরমাণু, নিউকিয়াস চূর্ণ করে তারা তার ভেতর থেকে শক্তি বের করে আনে। তারা জীবনের রহস্য অনুসন্ধান করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারে। আকাশে-মহাকাশে বিচরণ করতে পারে। মানুষের শরীর যে অণু, পরমাণু দিয়ে তৈরি হয়েছে তার বেশির ভাগ সৃষ্টি হয়েছে কোনো একটি নক্ষত্রের ভেতর। সেই হিসেবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আসলে একটি নক্ষত্রের অংশ। যে মানুষ নক্ষত্রের অংশ সেই মানুষ কেমন করে নীচ হতে পারে, হীন হতে পারে? তারপরও মাঝেমধ্যেই আমরা দেখি পৃথিবীর মানুষ চরম অবিবেচকের মতো কিছু একটা করে এই পৃথিবীটাকে কলুষিত করে তোলে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ যুদ্ধবিগ্রহ পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হলে পৃথিবীর মানুষ এক রকম কিন্তু সমগ্র মানবজাতিকে একসঙ্গে দেখা হলে মাঝেমধ্যেই কি মনে হয় না—এই মানবজাতি দাম্ভিক, স্বেচ্ছাচারী, অবিবেচক এবং কখনো কখনো অচিন্তনীয় নিষ্ঠুর?
পৃথিবীর এই অহংকারী দাম্ভিক মানবজাতিকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পদানত করে ফেলেছে ক্ষুদ্র থেকেও দ্রুত একটি ভাইরাস। পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব ছিল না, হঠাত্ করে তার জন্ম হয়েছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, অর্থে, বিত্তে, সম্পদে বলীয়ান হয়েও পৃথিবীর মানুষ তার সামনে অসহায়। এই দ্রুত থেকেও দ্রুত যে ভাইরাসটি প্রথম জন্ম নিয়েছিল সেটি যদি মানুষের মতো চিন্তাভাবনা করতে পারত তাহলে কি সে অট্টহাসি দিয়ে বলত, ‘পৃথিবীর মানুষ, তোমার কী নিয়ে অহংকার? সময় হয়েছে মাটির এই ধরিত্রীকে রক্ষা করার।’
ঠিক কী কারণ জানি না, আমি মাথা থেকে এই চিন্তাটা সরাতে পারি না!
করোনা ভাইরাস নিয়ে ঘরবন্দি হবার পর অনেক ছেলেমেয়ে, তরুণ-তরুণী, ছাত্র কিংবা সহকর্মীরা আমার জানতে চাইছে, ‘এরপর কী হবে?’ ‘আবার কি আমরা আমাদের আগের জীবন ফিরে পাব?’ কেউ কেউ আরো অনেক স্পষ্ট করে বলেছে, ‘স্যার, এতদিন বুঝতে পারি নাই, আমাদের জীবনটা আসলে কত সুন্দর ছিল।’
আমাদের বয়সি মানুষ যারা এই দেশের দুঃখকষ্ট যন্ত্রণার ভেতর বড়ো হয়েছি তারা কিন্তু এই সত্যটি অনেক দিন থেকে জানি। এই পৃথিবীটা সুন্দর, এই দেশটা আরো সুন্দর, এই জীবনটা তার থেকেও বেশি সুন্দর! আমার মনে মনটা আকুলিবিকুলি করত খুব ছোটো একটা কিছুর জন্য, একটা খোলা রাস্তায় মুক্ত স্বাধীনভাবে হাঁটার জন্য! আমি অনুমান করছি এখনকার যারা নতুন প্রজন্ম তাদের ভেতরেও নিশ্চয়ই এরকম একটা কিছু কাজ করছে! তারা বড়ো কিছু চাইছে না, ছোটো একটা কিছু চাইছে, আবার তারা স্কুলকলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, বন্ধুদের নিয়ে গল্প করবে, টংয়ে বসে চা খাবে।
করোনা ভাইরাসের এই বিষয়টি অনেক জটিল এবং তার অনেকগুলো মাত্রা আছে। তাই কোনো একজন যদি তার যে কোনো একটা মাত্রা নিয়ে একটুখানি লেখাপড়া করে নিজেকে একজন বিশেষজ্ঞ মনে করতে শুরু করে তাহলে অনেক বিপদ। কাজেই আমি খুব কঠিনভাবে বিশ্বাস করি যে, যারা জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন কিংবা যারা চিকিত্সা বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি জানেন শুধু তারাই এখন মুখ খুলতে পারেন। অন্যরা যখন মুখ খোলেন কিংবা কীভাবে এই বিপর্যয় বন্ধ করতে হবে সে ব্যাপারে উপদেশ দেন তখন আমি কখনো কৌতুক এবং বেশির ভাগ সময় বিরক্তি অনুভব করি।
তবে ইদানীং আমি পত্রপত্রিকায় বিদেশে থাকেন এরকম বাংলাদেশি ডাক্তারদের নানা ধরনের বিশ্লেষণ দেখতে পাচ্ছি। তারা যদি সত্যিই বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন তাহলে তাদের বিশ্লেষণ শুনতে আমার আপত্তি নেই; কিন্তু তারা যখন বিদেশে তাদের সুযোগ-সুবিধার কথা বড়ো গলায় বলেন কিংবা তার চেয়েও আপত্তিকর ব্যাপার, তারা যখন আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে তামাশা করেন তখন আমার খুবই বিরক্তি লাগে। তারা উন্নত দেশে মহাধুমধামে থাকতে থাকুন আমার কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু তাদের জানতে হবে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা এই দেশে যে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমরা সেটা নিয়ে তাদের জন্য অনেক গর্ব অনুভব করি। শুধু তাই না, আমরা চাইব আমাদের সরকার যেন সবার আগে এই স্বাস্থ্যকর্মীদের পুরোপুরি নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। তার জন্য যা করার প্রয়োজন সেটাই যেন করা হয়।
করোনা-বিপর্যয় শুরু হবার পর আমরা অনেকগুলো মন খারাপ করা খবর পেয়েছি। আমি সেগুলোর কথা পুনরাবৃত্তি করে আবার নতুন করে কারো মন খারাপ করে দিতে চাই না। তবে একটি ঘটনার কথা আমার একটু বলতেই হবে। সেটি হচ্ছে মুখে মাস্ক না থাকার কারণে মনিরামপুরের এসিল্যান্ড দুই জন বয়স্ক মানুষের কান ধরিয়ে তাদের ছবি তুলেছেন। একজন মানুষকে অপমান করার দৃশ্য সবসময়ই দৃষ্টিকটু, আমরা কখনই সেটা দেখতে চাই না। মনিরামপুরের এই ঘটনাটি ব্যতিক্রমী, কারণ এই দৃষ্টিকটু ঘটনার ছবিটি বাইরের কেউ গোপনে তুলে প্রকাশ করে দেননি। এসিল্যান্ড নিজেই সেই ছবি তুলে প্রকাশ করেছেন। যার অর্থ এই সরকারি কর্মকর্তা জানেন না কাজটি অন্যায়। এই কাজটিকে তিনি তার কর্তব্য পালনের অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছেন, কাজটি করে তিনি গর্ব অনুভব করেছেন।
সরকারি এই চাকরিগুলো দেশের সবচেয়ে লোভনীয় চাকরি, এই দেশের ছেলেমেয়েরা এই চাকরির জন্য জীবনপাত করে দেয়। চাকরি পাবার পর তাদেরকে নানা ধরনের ট্রেনিং দিয়ে কর্মক্ষেত্রে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। (আমি নিজে একাধিকবার তাদের ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে তাদের সামনে কথা বলেছি!) তবে সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে—এত কিছুর পরও এই সরকারি কর্মকর্তাদের একেবারে সবচেয়ে মৌলিক বিষয়টি শেখানো হয়নি। তারা জানেন না যে, মানুষকে কখনো অসম্মান করা যায় না। সেই মানুষটি যেই হোন না কেন! আমাদের দেশে আমরা কেমন করে এভাবে ব্যর্থ হলাম? এই ঘটনাটি যেভাবে হোক আমাদের চোখের সামনে চলে এসেছে, আমাদের চোখের আড়ালে ঘটে যাচ্ছে এরকম কতগুলো ঘটনা আছে?
আমি আরো একটা বিষয় সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য এই ঘটনাটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। খুবই স্বাভাবিক ভাবেই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে, সবাই বলেছেন, দুই জন বয়স্ক মানুষকে এভাবে অপমান করার অধিকার কারো নেই। আমি একটু অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, সাধারণভাবে মনে করে নেওয়া হয়েছে মানুষ দুই জন বয়স্ক না হলে এটি তত গুরুতর বিষয় হতো না, অর্থাত্ কমবয়সিদের অপমান করা যায়, শিশুদের অপমান করা যায়।
আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই—শুধু বয়স্ক মানুষকে অপমান করা যায় না এটি মোটেও সত্যি নয়, কোনো মানুষকেই অপমান করা যায় না। মানুষটি শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক—তাতে কিছু আসে যায় না। আমরা সবাই তো একসময় শিশু ছিলাম, আমাদের কি শৈশবের কথা মনে নেই? অনেক ঘটনার কথা ভুলে গেছি কিন্তু; যতবার স্কুলের শিক্ষক বা বড়ো মানুষ আমাদের অপমান করেছে তার প্রত্যেকটির কথা স্পষ্ট মনে আছে।
যেহেতু এই দেশে আমার অগ্রজ হুমায়ূন আহমেদ প্রায় সবারই প্রিয় একজন মানুষ, তাই তাকে নিয়ে শৈশবের একটি ঘটনার কথা বলা হয় তো খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আমরা তখন বান্দরবান থাকি, বাসার সামনেই স্কুল, সেই স্কুলে ভাইবোনেরা সবাই পড়ি, আমরা ওয়ান কিংবা টুতে হুমায়ূন আহমেদ আমার থেকে তিন ক্লাস ওপরে। হুমায়ূন আহমেদ যেহেতু দুষ্টুর শিরোমণি ছিল, প্রায় সময়েই সে স্কুলের ঝামেলায় পড়ে যেত। সেভাবে একবার ঝামেলায় পড়েছে, শিক্ষক তাকে শাস্তি দেবেন। সেই স্কুলের একটা ভয়াবহ ঐতিহ্য ছিল, কখনো কখনো কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তার বুকে একটা কাগজে অপরাধের বর্ণনা লিখে দেওয়া হতো, তারপর দপ্তরি তাকে স্কুলের সব ক্লাসে নিয়ে যেত। সারা স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী সেটা দেখত। হুমায়ূন আহমেদকেও সেই শাস্তি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলো। হুমায়ূন আহমেদ তার শিকক্ষকে কাকুতিমিনতি করে বলল, স্যার, ‘আমাকে আপনি যা ইচ্ছ শাস্তি দেন, এই ক্লাসের ভেতর আমাকে যত ইচ্ছে পেটান কিন্তু আমাকে ক্লাসে ক্লাসে পাঠাবেন না। আমার ছোটো ছোটো ভাইবোনেরা আমাকে দেখবে, আমি খুব লজ্জা পাব।’ সেটা শুনে শিক্ষক দ্বিগুণ উত্সাহিত হয়ে তার বুকে অপরাধের বর্ণনা লিখে তাকে দপ্তরির হাতে ধরিয়ে দিলেন।
ক্লাস রুম থেকে বের হওয়ামাত্র সেই আট-দশ বছরের শিশু হুমায়ূন আহমেদ দপ্তরির শক্ত হাত থেকে ঝটকা মেরে নিজেকে মুক্ত করে স্কুল থেকে ছুটতে ছুটতে বাসায় চলে এসে সে কী কান্না!
এই ছোটো শিশুটি যে অপমান সহ্য করতে রাজি হয়নি পৃথিবীর কোনো শিশুই সেই অপমান সহ্য করতে রাজি নয়। আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের সেটি কি শেখানোর সময় হয়নি? শিশু হোক বয়স্ক হোক কাউকে কখনো অপমান করা যায় না। (শিশু হুমায়ূন আহমেদের সেই ঘটনার পর সেই স্কুল থেকে এই ভয়ংকর নিয়মটি চিরদিনের মতো তুলে দেওয়া হয়েছিল।)
এটি করোনার কাল, আমরা এখন শুধু করোনা নিয়ে কথা বলি। খুব আশা করে আছি এই করোনার কাল শেষ হবে আমরা তখন আবার আকাশ-বাতাস নিয়ে কথা বলব, দেশ নিয়ে কথা বলব, রাজনীতি নিয়ে কথা বলব, বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলব, সাহিত্য নিয়ে কথা বলব। আমরা সবাই সে জন্য অপেক্ষা করে আছি। যতদিন সেটি না হচ্ছে সবাই নিয়মনীতি মেনে ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক।
এপ্রিল ১, ২০২০
লেখক :শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

