‘হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী’

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৮

শতাধিক বত্সর পূর্বে এই পৃথিবী এখনকার মতো এত রুক্ষ ছিল না। কিন্তু যতটুকু ছিল, ততটুকুতেই রবীন্দ্রনাথ সেই সভ্যতাকে অভিহিত করিয়াছেন ‘নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী’ হিসাবে। বলিয়াছেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,/ লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর’। আর এখন? প্রকৃতিকে নিয়ত নিষ্ঠুরভাবে খোঁচাইতে থাকিলে একসময় আসে বিনাশের পালা। যেই চারটি মূল উপাদান অর্থাত্ মাটি, পানি, বাতাস আর ভূজীববৈচিত্র্য লইয়া এই পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান গঠিত তাহা ভয়ংকরভাবে ধ্বংস করিতেছি আমরা। ইহার শুরু হইয়াছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে, যখন ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের পর কয়লা, খনিজ তেল, ইস্পাত, সিমেন্ট ইত্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহারে বদলাইয়া যায় পৃথিবীর শিল্প-মানচিত্র। এই বদলানোর প্রাথমিক কিছু সুফল সারা বিশ্বের মানুষ পাইয়াছে বটে। মানুষের জীবনযাত্রার গুণমানের ব্যাপক উন্নতি লাভ করিয়াছে। কিন্তু প্রকৃতিকে ইচ্ছামতো ক্ষতবিক্ষত করিলে প্রকৃতি তাহার ভারসাম্য হারায়।

কথিত আছে, মহাকবি কালিদাস বাল্যকালে নিতান্তই হাবাগোবা ছিলেন। তিনি একবার একটি উঁচু গাছের মগডাল কাটিতেছিলেন ঐ ডালটির অগ্রভাগে বসিয়া। ডালের আগায় বসিয়া উহা কর্তন করিলে কী ঘটিতে পারে, তাহা বুঝিতে পারে নাই বোকা কালিদাস। মানুষের নিকট তাহার প্রয়োজনটাই শেষ কথা। যেমন কালিদাসের প্রয়োজন ছিল একটি গাছের ডাল। তেমনি মানুষও নিজের প্রয়োজন মিটাইতে পরিবেশের ভারসাম্যের কথা ভাবে নাই। ১৯৭২ সালে স্টকহোম বসুন্ধরা সম্মেলনে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো উচ্চারণ করিলেন—কারখানার চিমনি হইতে নির্গত ধোঁয়া দূষিত করিতেছে বাতাস, অপরিশোধিত নোংরা পানি বিষাইয়া দিতেছে নদীর পানি এবং যত্রতত্র ফেলিয়া দেওয়া কঠিন বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক হইয়া উঠিয়াছে। সেই প্রথম প্রায় ৪৮ বছর পূর্বে পৃথিবীর মানুষ স্বীকার করিল, মানুষের কর্মকাণ্ডে বাস্তুতন্ত্রের সকল উপাদান আস্তে আস্তে কার্যকারিতা হারাইতেছে। আমাদের বাঁচিয়া থাকিতে গেলে যেই জমিটা লাগে তাহার একটা হিসাব যদি করা যায় তাহাকে বলে ‘ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট’। পৃথিবীতে এখন জনসংখ্যা সাড়ে সাত শত কোটির কিছু বেশি। এত মানুষের বাঁচিয়া থাকিতে যেই পরিমাণ অক্সিজেন লাগিবে, যেই পরিমাণ খাদ্য লাগিবে, যেই পরিমাণ অন্যান্য উপকরণ লাগিবে তাহা জোগান দিতে মাথাপিছু ১.৭০ গ্লোবাল হেক্টর জমি প্রয়োজন। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল, আরো আট বত্সর আগেই এই চাহিদা ছিল প্রায় ২.৬ গ্লোবাল হেক্টর। অর্থাত্ ২০১২ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যাকে পরিষেবা দিতে প্রায় দেড়খানা পৃথিবী আমাদের দরকার ছিল! এই ব্যাপক চাহিদা মিটাইতে চাপ পড়িতেছে পৃথিবীর সকল কিছুর উপর। অর্থাত্, আমরা আমাদের পৃথিবীর স্থায়ী আমানত ভাঙিয়া খাইতেছি। পৃথিবীর বনাঞ্চল, ভূগর্ভের জলস্তর, বায়ুর নানা উপাদান, ভূজীববৈচিত্র্য ইত্যাদিকে আমরা ক্রমশ ধ্বংস করিয়া নিজেদের জীবনযাপনের উপাদান সংস্থান করিতেছি।

বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, গত ৫০-৬০ বত্সরে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের যেই অবক্ষয় ঘটিয়াছে, তাহা পৃথিবীর গত ৮ লক্ষ বত্সরের ইতিহাসে কখনো ঘটে নাই। প্রশ্ন হইল, আমরা আর কতকাল কালিদাসের মতো বোকা রহিব? ডাল ভাঙিয়া ভূপতিত হইবার পর?