তাইওয়ান প্রণালিতে মৃদু উত্তেজনা বাড়তে পারে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৮

হাসান জাবির

ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বিশ্ব। চলমান এই বিশ্বসংকটের মূল কারণ নভেল করোনা ভাইরাস। ইতোমধ্যে এই ভাইরাসের গণসংক্রমণ ও বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী সীমাহীন দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি রীতিমতো বিপর্যস্ত। ঘটনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও চরম সংকটাপন্ন। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের উত্পত্তি ও বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তি চীন ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে বাগ্যুদ্ধ। একে অপরকে নানাভাবে দায়ী করে দুই দেশের চিরবৈরিতা করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এরকম সময়ে হঠাত্ করেই চীন-মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তাইওয়ান প্রণালিতে সৃষ্টি হয়েছে মৃদু উত্তেজনা। ঘটনার সূত্রপাত চীনের জঙ্গিবিমানের অতি সাম্প্রতিক একটি মহড়াকে কেন্দ্র করে। উল্লেখ্য, গত মাসের শেষদিকে পিপলস লিবারেশন এয়ারফোর্সের চারটি জঙ্গিবিমান ঘটা করেই তাইওয়ানের আকাশসীমা অতিক্রম করে নির্দিষ্ট মহড়া সম্পন্ন করে। স্থানীয় সময় মধ্যরাতের ঐ আকস্মিক মহড়ায় চায়না বিমানগুলোর বিচরণকে অত্যন্ত আগ্রাসি হিসেবে বিবেচনা করে তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ। চীনা বিমানবাহিনীর এরকম আগ্রাসি আচরণে তাইওয়ান অনেকটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ঘটনার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাইপের কর্তৃপক্ষ চীনের তত্পরতার নিন্দা জানান। পাশাপাশি তাইওয়ান আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভবিষ্যতে চীনের এ ধরনের আগ্রাসী আচরণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতির প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন। চীন তাইওয়ান বিরোধের এ পর্যায়ে মাত্র  গত সপ্তাহে তাইওয়ান প্রণালিতে একটি যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করে আমেরিকা। এ সময় এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিয়োজিত মার্কিন সপ্তম নৌবহরের একটি গাইডেড মিশাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ম্যাক ক্যাম্পবেল তাইওয়ান প্রণালি অতিক্রম করে। তাইওয়ান প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রমকালে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারটি প্রতিপক্ষের কোনো আক্রমণের শিকার হয়নি। কিংবা তাত্ক্ষণিকভাবেও সৃষ্টি হয়নি কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতির। এই মার্কিন পদক্ষেপ কার্যত চায়না তত্পরতার জবাবে তাইওয়ানের প্রতি দেশটির সমর্থনের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ, যা সহসাই চীনকে ক্ষুব্ধ করার জন্য যথেষ্ট। কেননা চীন তাইওয়ান প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় যে কোনো সামরিক যান চলাচল সীমিত রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে কিংবা তাইপের চীনবিরোধী তত্পরতাকে সামরিকভাবে দুঃসাহসী করে তুলবে—এরকম যে কোনো পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংগত কারণেই ধারণা করা যায় যে—তাইওয়ান প্রণালির সর্বশেষ মার্কিন পদক্ষেপের অবশ্যই পালটা প্রতিক্রিয়া দেখাবে চীন। এর ফলে বিরূপ বিশ্ব প্রেক্ষাপটের মধ্যেও ঐ জলরাশিতে উল্লিখিত দুই দেশ নতুন করে আরো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই আশঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তাইওয়ান সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপ। বিশেষ করে, মার্কিন মিশাইল ডেস্ট্রয়ার ম্যাক ক্যাম্পবেল তাইওয়ান প্রণালি অতিক্রম ও তত্পরবর্তী ঘটনাকে সমর্থন জানিয়ে তাইপের ডিফেন্স মিনিস্ট্রির বিবৃতি চীনকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। ঐ বিবৃতিতে মার্কিন নৌযানের বিচরণকে খুব সাধারণ কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করে ভবিষ্যতেও এই তত্পরতা অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব-উত্তর মূল ভূখণ্ড চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ তাইওয়ান। মূলত মূল ভূখণ্ডের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রযাত্রার শেষ ধাপে চীনের গৃহযুদ্ধে ক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাইশেক ও তার অনুগতরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। এ পর্যায়ে ৪৯ সালেই তারা সদলবলে তাইওয়ানে আশ্রয় নেন। এর ফলে মূল ভূখণ্ডে একচ্ছত্র আধিপত্য সত্ত্বেও তাইপের নিয়ন্ত্রণ হারায় সমাজতন্ত্রীরা। বিপরীতে চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বে তাইওয়ানে নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলে চীন থেকে স্বাধীনতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন জাতীয়তাবাদীরা। ফলে এই অমীমাংসিত ইস্যুটি চীন তাইওয়ান বিরোধের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটায়। যদিও চীন বরাবর তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেন। বেইজিং নিজের ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থাকা তাইওয়ানকে সব সময় নিজের প্রদেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। অন্যদিকে তাইওয়ান প্রথম থেকেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি আমেরিকার সমর্থন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হন। তাইওয়ান ইস্যুতে চীন-মার্কিন মতৈক্য সত্ত্বেও আমেরিকা বরাবর এক চীন নীতির বরখেলাপ করেন বলে প্রায়শই অভিযোগ ওঠান বেইজিং। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকা তাইওয়ানের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তাইপের কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যায়। যে কারণে চীন তাইওয়ানে সরাসরি শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনো অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ’৪৯ সালের পর থেকে অদ্যাবধি তাইওয়ানের ওপর চীনের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অন্যান্য সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। এই বাস্তবতার আলোকে গত দশকের শেষ দিকে চীন তাইওয়ানের সম্ভাব্য স্বাধীনতা ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সামরিক পদক্ষেপের হুংকারসংবলিত একটি আইন অনুমোদন করেছে। চীনের আভ্যন্তরীণ এই আইনের মূল কথা হচ্ছে তাইওয়ান কোনো কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে, চীন সেখানে অবধারিত সর্বাত্মক সামরিক হামলা চালিয়ে তা প্রতিহত করবে। এই আইনের মাধ্যমে চীন আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে তাইওয়ান ইস্যুতে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। চীনের এই বার্তাকে সত্যিকার হুংকার হিসেবে নিয়েই আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতা আমেরিকাসহ তার মিত্ররা খুব ভালোভাবেই পর্যালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সজাগ থেকেই আমেরিকা তাইওয়ান সম্পর্ককে নতুন রূপ দিতে চেয়েছেন ওয়াশিংটন। এই ধারাবাহিকতায় বেশ কিছুদিন থেকেই তাইওয়ানে নতুন করে সামরিক সরবরাহের কথা ভাবছে আমেরিকা, যা আমেরিকা চীনের মধ্যকার বিরোধকে আরো তীব্র করেছে; দুই দেশের বাগ্যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে স্পর্শকাতর এলাকায় সামরিক সমাগম ও মোতায়েনের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এরকম বাস্তবতার মুখেই আমেরিকা কর্তৃক তাইপেতে কিছু উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সর্বশেষ প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে বেইজিং। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছুদিন থেকেই নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য একধরনের উত্তেজনা লক্ষ করা যাচ্ছে। করোনার প্রকোপে এ নিয়ে উভয় পক্ষ কিছুটা শৈথিল্য নীতি গ্রহণ করলেও অতি সম্প্রতি তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ফলে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন-আমেরিকার মধ্যকার সর্বশেষ অবনতিশীল পরিস্থিতি যে কোনো মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দুই শক্তি আমেরিকা ও চীন বিশ্বের অনেক ইস্যুতেই বিভক্ত। বিশেষ করে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই দুই দেশ দীর্ঘকাল ধরে প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে আছে। এর মধ্যে আন্তঃকোরিয়া বিরোধের দুই পক্ষ চীন ও আমেরিকা যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে একধরনের প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত আছেন। কোরীয় উপদ্বীপের সামরিক বাস্তবতা আমলে নিলে চীন-মার্কিন সংঘাতের বিভিন্ন উপলক্ষ্য আমরা এখানে দেখতে পাই। একই সঙ্গে চীন-জাপান বিরোধেও আমেরিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। অন্যদিকে গত দশক থেকে চীনের অধিকারায়িত জলরাশি দক্ষিণ চীন সাগরের সীমানাসংক্রান্ত বিরোধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা। দক্ষিণ চীন সাগরসংক্রান্ত আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সীমানা বিরোধে বরাবর নাক গলাচ্ছে আমেরিকা। ফলে সেখানেও দুই দেশের মধ্যকার একধরনের সামরিক উত্তেজনা প্রায়শই লক্ষ করা যায়। এর সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার স্থায়ী মতপ্রার্থক্য হচ্ছে তাইওয়ান ইস্যু। যেখানে দুই পক্ষের অবস্থান অনঢ়। উল্লিখিত তিনটি ইস্যুর মধ্যে চীনের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাইওয়ান। চীন নিজের যত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে তার মধ্যে তাইওয়ানকে নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করা বেইজিংয়ের প্রথম অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। ৪৯ সালের পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও বেইজিং তার তাইওয়ান-সম্পর্কিত নীতির কোনো পরিবর্তন আনেন নাই। এক্ষেত্রে কোন ধরনের চাপকেও আমলে নেয় না চীন। ফলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্থানের সঙ্গে বেইজিং কর্তৃক তাইওয়ানে শক্তি প্রয়োগের আশঙ্কাও রীতিমতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এরকম বাস্তবতার মুখে তাইওয়ান প্রণালির সর্বশেষ ঘটনাবলি আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত উদ্বেক উত্কণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। আর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে যে কোনো মুহূর্তেই পরিস্থিতির আরো অবনতি ডেকে আনতে পারে বলেই অনুমান করা যাচ্ছে।

n লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও

নিরাপত্তা বিশ্লেষক