আলোকপাত

করোনা মহামারি রূপে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৯

মোস্তফা তারিকুল আহসান

গত ডিসেম্বরের শেষে চীনে ছড়িয়ে পড়ার পর কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস এখন গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। মহামারির প্রকৃত চরিত্র সে এখন দেখাচ্ছে আর মানবসভ্যতাকে বিলীন করার চেষ্টা করছে। বিশ্বের উন্নত দেশ যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের দশা কী হবে, যেখানে ভালো চিকিত্সাসেবা অন্য সময়েও আমরা আশা করতে পারি না?

আইইডিসিআরের রিপোর্ট বলছে, তারা এখনো কমিউনিটি সংক্রমণের সীমিত আলামত পেয়েছে। তবে সারা দেশের সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে যে অনেক মানুষ সংক্রমণের আশঙ্কায় রয়েছে। এটা বহগুণে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা মোকাবিলা করার সাধ্য আমাদের থাকবে না। সরকার অবশ্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করে মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার ও প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। সব ধরনের সমাবেশ, সভা ও জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে মসজিদে নামাজ পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। যেখানে কাবা শরিফে জামাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে আমরা কেন মসজিদে নামাজ নিষিদ্ধ করছি না বোঝা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে আজানের বাণী পালটে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাড়িতে নামাজ পড়ুন। আমাদের নবি (স.) মহামারির সময় সবাইকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে নিজ নিজ স্থানে অবস্থান করতে  বলেছেন। ধার্মিক মুসলিমরা নবির বাণী অনুসরণ করে ঘরে থাকা মেনে নেবেন আশা করি। ধার্মিক মুসলমানদের বোঝাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

সারা বিশ্বে এই ভাইরাস নিয়ে, এর মারাত্মক আঘাত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সাংবাদিক, গবেষক, বিজ্ঞানি নানাবিধ আলোচনায় লিপ্ত হচ্ছেন। সবাই হতাশ ও বেদনার্ত, কেউবা ক্ষুব্ধ। বিবিসির ইতালি প্রতিনিধ সিমা অ্যাটোচি প্রতিদিন রিপোর্ট দেওয়ার সময় তার চোখ জলে ছল ছল করছে। বিজ্ঞানিরা বলছেন, ক্রিড়া ও বিনোদন জগতের সেলিব্রেটিদের জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, বিজ্ঞানের জন্য বা গবেষণার জন্য সে তুলনায় নগণ্য অর্থ ব্যয় করা হয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে নিজের দেশকে শক্তিশালী করার জন্য যে অস্ত্র তৈরি করা হয়, সে তুলনায় চিকিত্সা গবেষণায় সামান্যই ব্যয় করা হয়। সোজা কথায় মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে মারার জন্য পৃথিবীতে অধিক পরিমাণে অর্থ ব্যয় করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানুষ মারার জন্য যে জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কথা সবার জানা। করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীতে যে অন্ধকার নেমে আসবে, তার জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া বা ভোগবাদী চিন্তকদের নতুন করে ভাবতে হবে। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মহাক্ষতি হয়েছে। এখন যখন কোটি মানুষ কাজ হারাবে, তখন সেই মানুষ কী করবে? কেউ আসলে বলতে পারে না এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের ছোবল কত দূরে যাবে। কোথায় নিয়ে যাবে পৃথিবীকে।

চারদিকে শুধু হুঁশিয়ারি আর সাবধানবাণী শুনতে পাচ্ছি। আমাদের দেশেও লকডাউন শুরু হয়েছে আংশিকভাবে। প্রকৃত লকডাউন করার অবস্থা আমাদের এখানে সম্ভব নয়। কারণ গৃহবন্দি গরিব দিনমজুর কীভাবে ঘরে বসে থাকবে? সন্তানের মুখে খাবার দেওয়ার জন্য তাকে তো বের হতেই হবে। সরকারের উচিত গরিব মানুষের জন্য বা চাকরি হারানো মানুষের জন্য প্যাকেজ ঘোষণা করা। আমাদের মতো গরিব আর বহুল জনসংখ্যার দেশের জন্য আরো ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে কি না, আমরা জানি না। তবে মনোবল না হারিয়ে এই হায়েনার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ যে প্রবিধান দিচ্ছে, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। গণসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এর সঙ্গে দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ। শুনেছি, অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাস্ক ও পিপিই তৈরি করছে। অনেক স্বেচ্চাসেবক দল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি হাসপাতাল জীবাণুমুক্ত করার কাজ শুরু করছে। এটা আশার খবর। সরকার চিকিত্সার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত ডাক্তার আনার কথা বলছে। মহামারির বিরুদ্ধে সবাইকে এখন একযোগে কাজ করতে হবে।

n লেখক :কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রফেসর,

ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়