করোনা মোকাবিলায় করণীয়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৯

সুব্রত কুমার পাল

স্থানীয় সরকার বিভাগের হিসেবমতে আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪৫৭১টি। সে হিসেবে মোট ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ৫৯৪২৩ জন, পৌরসভায় ৪২৪৪ জন,  উপজেলা পরিষদে ২৪৬০ জন, সিটি করপোরেশনে ৫৩৯ জন এবং জেলা পরিষদে ৬১ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ৯১৫ জন সদস্য, সংরিক্ষত ৩০৬ জন নারী সদস্য আছেন। সবমিলিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ৬৭৯৪৮ জন। সবার মধ্যে সদিচ্ছা থাকলে করোনা মোকাবিলায় বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ। আরেকটি বিষয়—স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে সেবা করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীর সংখ্যা গড়ে এর তিনগুণ হলে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দুই লাখের অধিক। তাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে এই সংকটে আমাদের মতো দেশে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে নিদের্শনা থাকলেও করোনা প্রতিরোধে তৃণমূলে খুব একটা প্রতিফলন দেখা যায়নি কার্যকরভাবে। একদিকে যেমন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সংকটে পড়েছে, তার চেয়েও বড়ো বিষয় হলো সাধারণ মানুষকে করোনা প্রতিরোধে সচেতন করে তোলা। পরিবেশ এবং পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, আমরা যদি আমাদের গ্রামগুলোকে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে চাই—তাহলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদ প্রতিনিধিদের কার্যকর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের এখনই সময়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই জনকল্যাণে ভূমিকা রাখা।

রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে জানা যাচ্ছে—সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে বসছে হাট-বাজার, আড্ডা, দলবেঁধে চলাফেরা, স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা না করা। আর এইক্ষেত্রে খুব একটা দেখা মেলেনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা। তবে ভিন্ন চিত্রও কিছু কিছু জায়গায় দেখা গেছে, তা অস্বীকার করা যাবে না; তবে সবার সমন্বিত অংশগ্রহণ একটি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তাই জনসচেতনতা সৃষ্টিতে জনপ্রতিনিধিদের এখনই কাজে নামতে হবে।

রাষ্ট্রের শাসনকার্য যথাযথভাবে পরিচালনায় স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মূল কারণ হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা স্থানীয়ভাবেই সমাধান করা। ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, পরিষদের প্রধান কার্যাবলিতে জনকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, সেইসঙ্গে আরো বিষয় যুক্ত। অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০, বাংলাদেশের সংবিধানে স্থানীয় সরকার পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কার্যকর পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যাতে প্রশাসনের প্রতিটি ইউনিটে জনগণ কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনেক। উপজেলা পরিষদের জন্য ৩১টি কাজ আইনগতভাবে নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে এই পরিষদের কাজ খুবই সীমিত। জেলা পরিষদের (তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া) জন্য নির্ধারিত কাজ রয়েছে ৬৩টি। কিন্তু উপজেলা পরিষদের মতো তারাও এডিপিভুক্ত কিছু উন্নয়নকাজ ছাড়া দৃশ্যমান আর কোনো কাজ করে না। জেলা পরিষদের এই কাজও দৃশ্যমান হয়েছে জেলা পরিষদ নির্বাচনের পর। পৌরসভার জন্য আইনে সবমিলিয়ে কাজের সংখ্যা ১৭২টি। কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন, নর্দমা পরিষ্কার, জন্ম-মত্যু নিবন্ধন ও কিছু প্রত্যয়নপত্র  দেওয়া, টিআর-কাবিখা বিতরণের মধ্যেই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ। আইনে সিটি করপোরেশনের জন্য ১৬০টি কাজ নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু তারাও অনেকটা বৃহত্তর পরিসরে পৌরসভার কাজগুলোই করে থাকে। বড়ো শহরগুলোতে সিটি করপোরেশনের কাজে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও রয়েছে।

এখন সময় এসেছে জনপ্রতিনিধির কার্যকর ও যথাযথ দায়িত্ব পালনের। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুবিধা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেবেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা। এতে একটি কার্যকর শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

রাজশাহী