মো. গোলাম মোস্তফা
মানুষের জীবনে রোগ থাকে, শোক থাকে, থাকে হাসি-আনন্দ। কারো রোগ-শোকে আপনজন এগিয়ে আসবে, সাহায্যের হাত বাড়াবে, পাশে থেকে সমবেদনা জানাবে, সাহস জোগাবে। কেউ মারা গেলে সত্কারে শামিল হবে। আর কারো হাসি-আনন্দে ভালো লাগবে অনেকক্ষেত্রে অংশীদার হবে—এটাই চিরন্তন। কিন্তু ভাবুন তো—কারো বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তান অথবা আপন কেউ একজন মারা গেছেন; অথচ নিকটজন হয়েও তার কাছে যেতে পারছেন না! শেষ বিদায়ের করণীয়টুকুও করতে পারছেন না। তাদের কেউ একজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। সে এক ঘরে, একা বন্দি জীবনযাপন করছে। বিষয়টি কী করুণ আর বেদনাদায়ক-ই না।
ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে পৃথিবীতে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। আক্রান্ত সাড়ে ১০ লাখ। আমাদের দেশেও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর। এর বাইরে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন আরো কয়েক জন। সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। কেউ কেউ ইচ্ছা করেই হাসপাতালে যাচ্ছেন না।
মানুষকে বলা হয় সবচেয়ে মানবিক প্রাণী। এজন্যই কারো দুঃখে ব্যথিত হই। কারো সুখে আনন্দ পাই। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে প্রিয় মানুষটির কাছে থাকতেই ভালোবাসি। কিন্তু আজ আমরা এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কী এক অমানবিক চিত্র-ই না দেখতে হচ্ছে আমাদের।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? চিকিত্সকরা বলছেন, নিজের জন্য, পরিবারের অন্যদের জন্য, সমাজের জন্য, সর্বোপরি রাষ্ট্রের জন্য এ অবস্থায় ঘরে থাকা জরুরি। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সকল পর্যায় থেকে আহবান জানানো হচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যেতে।
অথচ দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই এসবের তোয়াক্কা না করে বাইরে ঘোরাফেরা করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। স্টলে বসে চা খাচ্ছেন। এই মুহূর্তে চা খাওয়া, আড্ডা দেওয়া কি খুব জরুরি? কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসে আছেন। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। মানা হচ্ছে না নিরাপদ দূরত্ব। কী আত্মঘাতী আচরণই না করছি আমরা।
একবার ভেবে দেখেছেন, এ দুর্যোগ সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ফ্রান্স ও চীনসহ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখছি। আর এ পরিস্থিতি আমাদের হলে (মহান সৃষ্টিকর্তা যেন এমন না করেন) আমরা কি তা সামাল দিতে পারব? অবশ্যই অবস্থা কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। আসুন, এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে সচেতন হই। সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। আত্মঘাতী না হই।
আমরা সবাই জানি, এজন্য কষ্ট হয়তো হচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষদের কষ্ট অনেক বেশি। তবে আমরা সকলে সচেতন হলে এ কষ্ট সাময়িক।
গবেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থতিতে প্রকৃতি নাকি নির্মল শ্বাস নিচ্ছে। সারা পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ কমেছে। কমেছে বায়ুদুষণ। যারা বেঁচে থাকবে সেই মানুষগুলোর জন্য বাসযোগ্য এ পৃথিবী আরো বেশি উপযোগী হচ্ছে। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখুন, প্রকৃতি কী দারুণ সুন্দর সাজে সজ্জিত হচ্ছে। গাছে গাছে সবুজ পাতার সমাহার। ডাকছে পাখপাখালি। এরাও বোধহয় আমাদের বলছে, তোমরা ঘরে থাকো। তোমাদের জন্য আমরা পসরা সাজাচ্ছি। আর কয়দিন পরেই তা তোমাদের মধ্যে বিলিয়ে দেব। যখন তোমরা আবার কর্মময় জীবন নিয়ে বাইরে আসবে। প্রিয়জন নিয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে আবার বিমোহিত হবে।
নেত্রকোনা
