অণুগল্প

ঘুম ভেঙে যায়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:২০

 

দুই দিন তীব্র বুকের ব্যথায় চিত্কার, ছটফট করে কাটিয়েছি। ঘুম নেই। ভোরের দিকে তন্দ্রামতো হয়, কত কিছু যে স্বপ্নে দেখি! শৈশবে গ্রামে ছিলাম কিছুদিন, সেই স্মৃতিগুলিই ফিরে ফিরে দেখি।

মফিজ তেলি হাটে যাচ্ছে, কাঁধে বাউনকা, দুই কলস সরষের তেল। এভাবেই হেঁটে তিন মাইল দূরের কালিগঞ্জের হাটে যাবে। তার সঙ্গে যোগ দিলাম। সে বলছে, ‘হে, তুই না যাস। সিরাজুল মোক বকিবে।’ আমি তার সঙ্গে হাটে গেলাম। আবার দেখি গাঠু ঘুঘুর ফাঁদ পাতছে। গাঠুর সঙ্গে আমার খুব খাতির। নামটা যে আসলে কী ছিল সেটা গাঠুও জানে না, গোষ্ঠ পাল জাতীয় কিছু হবে। প্রহ্লাদ যেমন প্যাল্লেত হয়ে গেছে।

গাঠু ফাঁদ পেতে গাছের ছায়ায় বসে, আমি শুয়ে থাকি।

গাঠু কাকা, আপনি নাকি ডাকাতি করেন? 

গাঠুর চেহারাটা মলিন হয়ে যায়—‘শোনেক, কাঁই যে এগ্লা কথা কছে! মুই ডাকাত হনু হয় তো মোর প্যাটে ভাত নাই ক্যানে?’

বাবুল ভাইয়ের আব্বা চায়ের দোকান বাউনকায় ঝুলিয়ে যাচ্ছে, দৌড়ে গেলাম—‘কুঠে যাছেন?’

‘লক্ষ্মীর হাট।’

‘মুই যাং।’

‘ধুর চ্যাংড়া!  লক্ষ্মীর হাট এটে, ম্যালা দূর! হাঁটিবার পাবু নাই।’

হাটে গিয়ে আগে আমাকে ধোয়ামোছা করালেন। তারপর ৫০ পয়সা দিয়ে বললেন, ‘মুড়ি আনেক, আর একনা পিঁয়াজ আর আকালি আনবু।’

কলাপাতায় মুড়ি নিয়ে তেলিদের কাছে গিয়ে একটু সরষের তেল নিলাম। তারপর দুজনে পিঁয়াজে এক কামড়,  আকালি একটু নিয়ে দারুণ আনন্দে খাওয়া।

ছাড়া ছাড়া ভাবে মাকে দেখি—‘খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা?’

হ্যাঁ! মরে যাওয়া ভালো। আর পারছি না! 

ঘুম ভেঙে যায়!

আবার গতরাতে দেখি বড়ো মামা,  মজনু ভাই,  মোফাজ্জল ভাই,  ছোটো মামা,  মমিনুল ভাই সবাই মিলে কোদাল, খুন্তি, ঝুড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছেন।  আমাকে দেখে বড়ো মামা ডাক দিলেন, ‘বাউ এতি আইসেক।’

গেলাম সড়কে। গাছের গোড়ায় মাটি, রাস্তার যেখানে যেখানে গর্ত সেখানে মাটি দিয়ে সমান করা, গাছ লাগানো, গোরস্থানের জঙ্গল পরিষ্কার এসব করলাম।

এসব করছি কেন?

ছোটো মামা বললেন, ‘বাউ কাইল বিষুয়া। আইজ এগ্লা কাজ করা নাগে। দ্যাখিস নাই গেরামের সোউগে আইচ্চে।’

অনুকূল মামা এলেন। কাজ দেখে খুশি, ‘হামার উতিও ভালো কাজ হছে।’

তারপর সবাই মিলে কাঠগিরির বাঁশের চাটাইয়ের সেতু মেরামত। জগদিশ মামা পকেট থেকে একটা সন্দেশ বের করলেন, এগুলি ৫ পয়সা করে বিক্রি হতো—‘এ বাউ, ধরেক।’  মহা আনন্দে সন্দেশ খাই।

পরদিন খেতখামার-জঙ্গল খুঁজে শাকপাতা জোগাড়। বিশ রকমের না হলেও অনেক রকমের শাক ভাজি আর ঠাকরি কালাইয়ের খিচুরি। কী স্বাদ যে ছিল সে খাবারের!

তারপরের দিন চৈতসংক্রান্তি। মেলা, চড়ক, ঢোল বাজে ড্যাং ড্যাং। এসব ছাড়া ছাড়া দেখি। মানুষের মন এক আশ্চর্য জিনিস। কষ্ট ভুলিয়ে দিতে কত স্মৃতি যে জাগিয়ে তোলে!