মন্দা ঠেকাতে জরুরি উদ্যোগ দেশে দেশে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২২:২১

অর্থনীতির মন্দা এখন বিশ্বজুড়েই। করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে বিশ্বের পরাশক্তি থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল বা দরিদ্র সব দেশই এখন তাদের অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। সামনের দিনগুলোতে মহাসংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতির ক্ষতি কতটা হবে সেই হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিশ্ব নেতারা। বড়ো ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সবাইকে প্রণোদনার আওতায় আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। ইতিমধ্যে আসন্ন মন্দা থেকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন ও ভারত সরকার ৭ লাখ কোটি ডলারের বেশি খরচের পরিকল্পনা করেছে। মহামারিতে চাকরি হারানো কর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত ছোটো বড়ো শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা। সুদহার কমিয়েছেন প্রায় সব বড়ো অর্থনীতির দেশ।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনার পরিকল্পনা নিয়েছে। সুদ হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হয়েছে। চাকরি হারানোদের জন্যও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে ৬৬ লাখ বেকার ভাতার আবেদন জমা পড়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার ঋণ নিশ্চয়তা ও স্থানীয় ব্যবসায় কর স্থগিতের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি ডলার খরচের পরিকল্পনা নিয়েছে। কর্মীদের আগামী তিন মাস তাদের বেতনের ৮০ ভাগ সরকারের তরফ থেকে বহন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। জার্মান সরকার ৮২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফরাসি সরকার প্রণোদনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেকার কর্মীদের ৫ হাজার কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা    জানিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো এশিয়ার চীন, জাপান ও ভারত অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ভারত সরকার প্রণোদনার পাশাপাশি ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি রুপির আর্থিক ত্রাণ দেওয়াও ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের দরিদ্র মানুষদের নগদ সহায়তাসহ খাদ্যে ভর্তুকি দেওয়া হবে এই অর্থে। জাপান সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে উদ্যোক্তাকে রক্ষা করতে সরকারের কাছে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষ্যে জরুরি তহবিল গঠনের দাবি তাদের। সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পোদ্যোক্তাদের কী উপায়ে সহযোগিতা দেওয়া যায়, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর কাছে ক্ষয়ক্ষতি ও দাবির বিষয়ে জানতে চেয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল হালিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে কিছু সংগঠন তাদের বিষয়টি আমাদেরকে জানিয়েছে। পহেলা বৈশাখকেন্দ্রিক যে বিক্রি হতো, তা এবার হয়তো হচ্ছে না। এসব ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি। অর্থ বিভাগও কাজ করছে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা ৭৮ লাখ। শিল্প-বাণিজ্যের ৮০ থেকে ৮২ শতাংশই এসএমই খাতের অবদান। করোনা পরিস্থিতিতে সরকার রপ্তানিখাতের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ঘোষণা এসেছে। দুই শতাংশ সুদে রপ্তানিমুখী শিল্প এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু এসএমইসহ অন্যান্য খাতের জন্য এখনো কোনো উদ্যোগের ঘোষণা আসেনি। বাংলাদেশ এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলী জামান ইত্তেফাককে বলেন, এসএমই উদ্যোক্তারা অর্থনীতির লাইফলাইন। এ খাতের বিশাল সংখ্যক উদ্যোক্তা কঠিন সংকটে পড়তে যাচ্ছে। তারা সরকারের নীতি সহযোগিতা না পেলে একটি বড়ো অংশই ব্যবসা থেকে হারিয়ে যাবে। এসব উদ্যোক্তার জন্য চলতি মূলধনের যোগান নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিতে হবে।

ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের বিশাল বিনিয়োগের বস্ত্র খাতও। বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আসছে বৈশাখী উত্সব কার্যত বন্ধ থাকছে। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘদিন থাকলে আগামী ঈদেও চাহিদা কমে যাবে। এর ফলে বড়ো আকারের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে অনেক বস্ত্র শিল্পই টিকে থাকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। বিশেষত সুতা কাপড়ের ওপর থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করা, বিদ্যমান টার্ম লোনের সুদ ছয় মাসের জন্য মওকুফ করা ও দুই বছরের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া, ছয় মাসের জন্য গ্যাস-বিদ্যুত্সহ পরিসেবার বিল ব্লক অ্যাকাউন্টে রেখে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া, এ খাতে ব্যবহার হওয়া সব ধরনের কেমিক্যালের ওপর শুল্ককর প্রত্যাহার করা এবং বন্দরে আটকে থাকা কাঁচামাল ও পণ্যের ওপর কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ আরোপ না করার দাবি জানানো হয়। বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, করোনা ভাইরাসের এ পরিস্থিতিতে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের টেক্সটাইল মিলগুলো। সরকারের নীতি সহায়তা না পেলে বহু মিল ব্যবসা থেকে হারিয়ে যাবে। বেকার হবে লাখ লাখ শ্রমিক।

এদিকে গতকাল শুক্রবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পক্ষ থেকেও এসএমই উদ্যোক্তাদের রক্ষায় সরকারের কাছে একটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজ করা, ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ ব্যবস্থা শিথিল করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জন্যও সরকারের নিয়ম-নীতি আরো সহজ করার কথা বলা হয় ডিসিসিআইর পক্ষ থেকে। ডিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, বেতনভাতা পরিশোধের সুযোগ করে দিতে ১ শতাংশ সুদে ৩ বছর মেয়াদি গঠন হওয়া ঐ তহবিল থেকে যাদের বার্ষিক বিক্রি (টার্নওভার) ১ কোটি টাকা, তাদের জন্য ১ শতাংশ আর টার্নওভার ১ কোটি টাকার বেশি তাদের জন্য ২ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ১ বছরের গ্রেস পিরিয়ড (ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করা) দেওয়ারও দাবি জানানো হয়।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর বাইরে আগামী ছয় মাসের জন্য বিধিবদ্ধ জমার হার (এসএলআর) কমানো এবং আমানতের বিপরীতে ঋণ প্রদানের হার (এডি রেসিও) শিথিল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উদ্যোক্তারা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এমএসএমইর ওপর করের বোঝা লাঘব করতে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়কর জমা স্থগিত রেখে তা আগামী তিন বছরে সমান তিনটি কিস্তিতে ভাগ করে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জরিমানা ছাড়া প্রদান করার সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ভাড়া ছাড়াও বিদুত্, গ্যাস ও পানির বিল এবং লাইসেন্স নবায়নের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট আগামী ছয় মাসের জন্য মওকুফ করা, আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহূত সরঞ্জাম, রপ্তানিমুখী উত্পাদনকারী কারখানার ক্ষেত্রে আগাম কর (অ্যাডভান্স ট্যাক্স বা এটি) ও ভ্যাট পরবর্তী ছয় মাসের জন্য অব্যাহতি দেওয়া, বন্দরে বিলম্বে খালাসের জন্য আমদানিকারকদের জরিমানা ও ব্যাংক চার্জ মওকুফ করার পাশাপাশি পুঁজি ও কাজ হারানো ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।