এই অবহেলা কাম্য নহে

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:০০

করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক এখন বিশ্ব জুড়িয়া। বিভিন্ন উন্নত দেশও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে। চিকিত্সকরা জীবনের ঝুঁকি লইয়া করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিয়া যাইতেছেন। করোনার উত্পত্তিস্থল চীনে তো বটেই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও করোনার চিকিত্সা করিতে যাইয়া কয়েক জন চিকিত্সক পরবর্তী সময়ে নিজেরাই করোনায় আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। এই মৃত্যু সাহসের ও বীরত্বের। এইসকল চিকিত্সক মানব সভ্যতা ও চিকিত্সা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হইয়া থাকিবেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও সেইসকল দেশে করোনা ছাড়া অন্যান্য রোগের স্বাভাবিক চিকিত্সা বন্ধ হইয়া গিয়াছে— এমন খবর আমরা পাই নাই; কিন্তু বাংলাদেশে ঘটিতেছে একেবারে ব্যতিক্রম। করোনার আতঙ্কে ও নিরাপত্তার অজুহাত দেখাইয়া একশ্রেণির চিকিত্সক ক্যানসার, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ সাধারণ রোগের চিকিত্সাসেবা প্রদান হইতে বিরত রহিয়াছেন। প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রাখিয়াছেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরিয়াও অনেকে এইসকল রোগের স্বাভাবিক চিকিত্সাসেবা পাইতেছেন না। ইহাতে ইতোমধ্যে কয়েক জন রোগী বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। এই অবহেলা দুঃখজনক ও অমানবিক।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হইতে ৩ কোটি মানুষ কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। অনেক কিডনি রোগী রহিয়াছেন যাহাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করিতে হয়। দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী রহিয়াছেন ৩ কোটি। ৮৪ লক্ষ মানুষ ভুগিতেছেন ডায়াবেটিসে। তাহাদের অনেকের রহিয়াছে কিডনি জটিলতাও। ইহাছাড়া দেশের প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ মানুষ ঘাতক ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। এইসকল রোগের বাহিরেও আরো অনেক প্রকার অসংক্রামক রোগ রহিয়াছে। এমনকি প্রতি বত্সর এই সময় অনেকের জ্বর, সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা হয়। ইহা মৌসুমি রোগ হিসাবে বিবেচিত। এখন এইসকল রোগী কি স্বাভাবিক চিকিত্সা পাওয়ার অধিকার রাখেন না? যদিও উপসর্গের সহিত সাদৃশ্য রহিয়াছে, তাহার পরও সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর হইলেই যে তিনি করোনায় আক্রান্ত হইবেন এমন কোনো কথা নাই। পরীক্ষানিরীক্ষায় যদি ধরা পড়ে তিনি করোনায় আক্রান্ত, তাহা হইলেই তাহার ব্যাপারে কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনসহ পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। এই যে সাধারণ রোগীদের এই সময়ে হয়রানি, দৌড়াদৌড়ি ও ছোটাছুটি বাড়িতেছে এবং বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর অভিযোগ আসিতেছে, তাহা বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন।

অবশ্য এই সময়ে একজন চিকিত্সকের চিকিত্সাসেবা প্রদান করা বহুলাংশে ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। এই ঝুঁকির কারণে একজন চিকিত্সকের পরিবারের সদস্যরাও চাহিতেছেন না তিনি স্বাভাবিক চিকিত্সা প্রদান করুন। এমতাবস্থায় যাহারা চিকিত্সা প্রদান করিবেন, তাহাদের জীবনের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে নিশ্চিত করিতে হইবে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলিতেছেন, সরকার যে ধরনের পিপিই দিয়াছে, তাহা এক দিন ব্যবহার করিবার পর জীবাণুমুক্ত করিবার কোনো সুযোগ নাই। এইজন্য চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রত্যেককে অন্তত তিনটি করিয়া পিপিই দেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি এই মুহূর্তে অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। তাই একাধিক পিপিই সরবরাহে সরকারকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হইবে। যাহারা চিকিত্সাসেবা দিবেন, তাহারাই যদি ঝুঁকিমুক্ত থাকিতে না পারেন, তবে অন্যদের চিকিত্সাসেবা দিবেন কীভাবে? অতএব, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সকল চিকিত্সকের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-সরঞ্জাম সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে চিকিত্সক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের মনে রাখা উচিত যে,  রোগীর সেবা করাই তাহাদের প্রধান কর্তব্য। এই মানবসেবাই পরম ধর্ম। এইজন্য হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে তাহাদের নিয়মিত উপস্থিত থাকা বাঞ্ছনীয়।