মালিকবিহীন পথের পশুপাখিরা যেন অভুক্ত না থাকে

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৬

একটি বেসরকারি পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, ঢাকায় পথকুকুর রহিয়াছে প্রায় ষাট হাজার। আর সারাদেশে রহিয়াছে প্রায় সতেরো লক্ষ কুকুর। এই সকল প্রাণীর খাবারের অন্যতম উত্স মাংসের দোকান, হোটেল, ডাস্টবিন ও মানুষের ফেলিয়া দেওয়া খাবার। কিন্তু করোনার এই কালবেলায় দুস্থ মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য পথকুকুর, বিড়াল, পশুপাখি পড়িয়াছে ভীষণ বিপদে। ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াইতে বাংলাদেশেও চলিতেছে অঘোষিত লকডাউন। লকডাউনের কারণে ঘরবন্দি বেশির ভাগ মানুষ। ইহার জের ধরিয়া বন্ধ রহিয়াছে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-মোটেল। শহর-বন্দর, নগর-গ্রাম সবখানেই খুব সীমিত আকারে খোলা হইতেছে খাবারের দোকান। এমন পরিস্থিতিতে পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার আর পথেঘাটে থাকা কুকুরদের জন্য করোনা যেন দুর্ভিক্ষ ডাকিয়া আনিয়াছে। টানা কয়েক দিন ধরিয়া অভুক্ত এই সকল কুকুর-বিড়ালের অবস্থা এখন হাড্ডিসার।

খাবারের সংকটে দিশেহারা কুকুর-বিড়াল, কাক, পাখিরাও যে মানবসমাজের অংশ— তাহা মনে রাখিতে হইবে। সম্প্রতি এই বিষয়ে কিছু টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র যেই সকল সংবাদ প্রকাশ করিয়াছে, তাহাতে যে কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষের হূদয় আর্দ্র হইয়া উঠিবে। আশার কথা হইল, ইহা লইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পশুপ্রেমী মানুষ আগাইয়া আসিয়াছেন। অবরুদ্ধ নগরীতে ক্ষুধার্ত প্রাণীগুলিকে খাবার দিয়া পাশে দাঁড়াইয়াছেন কিছু কিছু পশুপ্রেমী মানুষ। কেবল ঢাকা নহে, অভুক্ত কুকুরগুলিকে নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া দেশের বিভিন্ন জেলার অনেকেই আগাইয়া আসিয়াছেন। এই চিত্র দেখা গিয়াছে রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায়। পশুদের জন্য আগাইয়া আসা এই সকল মানবিক মানুষের জন্য রইল আমাদের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। কিন্তু বাস্তবতা হইল, যেইটুকু খাবারের সংস্থান তাহাদের জন্য করা হইতেছে, তাহা অভুক্ত বিপুল প্রাণিকুলের তুলনায় খুব সামান্যই। নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে আগাইয়া আসা প্রয়োজন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে। প্রতিবেশী দুস্থ দরিদ্র মানুষটিকে সহযোগিতা করিবার পাশাপাশি পথের অভুক্ত প্রাণিগুলির জন্য সকলকেই কমবেশি খাবার লইয়া আগাইয়া আসিতে হইবে। তাহাতে বিপুলসংখ্যক প্রাণী এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময় কোনো রকমে বাঁচিয়া থাকিবার রসদ পাইবে।

মনে রাখিতে হইবে, এই সকল পশুপ্রাণিও আমাদের জৈব বাস্তুতন্ত্রেরই অংশ। তাহা ছাড়া পশুদের ভালোবাসাটা মানব মহত্ত্বের একটি বড়ো গুণ বটে। একটি প্রাচীন লক্ষণশাস্ত্র অনুযায়ী বলা হয় যে, কুকুরপ্রেমী মানুষ স্বভাবগতভাবে মুক্ত ও বিশ্বস্ত চরিত্রের হইয়া থাকেন। যদিও তাহাদের অনেককে বাহির হইতে ‘কঠিন ও কঠোর’ বলিয়া মনে হয়। কিন্তু তাহাদের ভিতরে মানবিকতার দুর্দান্ত অনুভূতি কাজ করে। বিড়ালপ্রেমীরা চরিত্রগতভাবে স্মার্ট স্বভাবের মানুষ। তাহারা স্বভাবের দিক হইতে বেশ ধৈর্যশীল হয় এবং এই জন্য স্বীয় লক্ষ্যে উপনীত হইতে পারে সহজে। বলা হইয়া থাকে, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। সুতরাং, প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা আমাদের সামাজিক দায়িত্বেরই অংশ। এই দুর্যোগের দিনগুলিতে আমরা যেন তাহা ভুলিয়া না যাই।