8 আরাফাত সরকার সেতু
টাইটানিক! বাস্তব ঘটনা আর সিনেমার ইল্যুশন-এই দুটোর কোনো এক প্রাসঙ্গিকতায় শব্দটি কানে এলেই এখনো পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় একটা শীতল বিষাদ স্রোত। ইতিহাসের কোনো বিয়োগাত্মক ঘটনার কথা বললে প্রথমেই চলে আসে উত্তর আটলান্টিকের বরফশৈলে ধাক্কা লেগে তত্কালীন সময়ের সর্ববৃহত্ জাহাজটির ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি। আটলান্টিকের অতলে হারিয়ে যাওয়া ১০ এপ্রিল ১৯১২ সালের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যপটটিই যেন মানুষের সামনে নতুন করে ১৯৯৭ সালে তুলে নিয়ে আসেন জেমস ক্যামেরন। অতীতের সত্য ঘটনা আর সিনেমার পর্দার বিচ্ছেদ রসায়নে ধাঁধার এক জটিল বিভীষিকায় আটকে যায় সব বয়সী চোখ।
সেবার অস্কারের প্রায় সবটা আলোই কেড়ে নিয়েছিল টাইটানিক। ১৯৯৮ সালে সেরা ছবির ক্যাটাগরিসহ মোট ১১টি অস্কার ঘরে তোলে জেমস ক্যামেরন বাহিনী। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, কথিত অভিশপ্ত জাহাজ টাইটানিককে নিয়ে তৈরি এ ছবি নির্মাণের সময় কলাকুশলী ও ক্রুদেরও যেন সেই অভিশাপ ঘিরে ধরেছিল। মুখোমুখি হতে হয়েছিল বিভিন্ন দুর্ঘটনার। সব ঘটনার মধ্যে চাওডার, মূলত এক ধরনের স্যুপ নিয়ে ঘটা একটি ঘটনা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বেশি। কারণ সেই স্যুপে কে মাদকদ্রব্য মিশিয়ে দিয়েছিল তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। যদিও ছবি নির্মাণের ২০ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু স্যুপ রহস্যের কোনো সুরাহা হয়নি আজও।
সেদিন ছিল ৮ আগস্ট, ১৯৯৬ সাল। কানাডার হ্যালিফেক্স বের পানিতে গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং পরিচালনা করেন জেমস ক্যামেরন। সঙ্গে প্রযোজক জন লান্ডো, ক্যামেরাম্যান কেলেব ডেসশ্যানেল, অভিনেতা বিল প্যাক্সটন ও সুজি আমিসও ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী কানাডায় ওইদিনই ছিল তাদের শেষ শুটিং। ছবির পরবর্তী শুটিং করতে তারা যাবেন মেক্সিকো। শুটিং শেষে মাঝরাতে স্থানীয় এক ক্যাটারিং কোম্পানি তাদের খাবার সরবরাহ করে। এরমধ্যে চাওডার বা স্যুপও ছিল। চাওডারের এমনিতে নানারকমের রেসিপি আছে, সেদিন কোন ধরনের চাওডার স্যুপ ছিল কেউই বুঝতে পারেনি।
ওইদিন ৬০ জনেরও বেশি মানুষ সেই স্যুপ খেয়েছিলেন। জেমস প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো খোলওয়ালা মাছের যে বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে সেটার কারণে এমন হচ্ছে। এ রাসায়নিক আবার শরীরের জন্য বিপজ্জনক। স্যুপ খাওয়া শেষে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বমি করেন। অভিনেতা প্যাক্সটনের ভাষায়, কেউ হাসছেন, কেউ কাঁদছেন, আবার কেউ লাফাচ্ছেন। কেউই স্বাভাবিক আচরণ করছিলেন না। সেদিন ডার্টমাউথ জেনারেল হাসপাতালে অবাক করা এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল। ক্রুরা এক বিছানা থেকে লাফিয়ে অন্য বিছানায় চলে যাচ্ছেন, হাসপাতালের করিডোরে হুইলচেয়ার নিয়ে দৌড়াচ্ছেন কেউ, কেউ আবার কিউবান কঙ্গা নাচছেন। ওই চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেই একজন ক্রু জেমসের মুখে কলম বিঁধিয়ে দিলো। জেমসের মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়া শুরু হলো, স্যুপের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও হাসছিলেন জেমস।
এদিকে, হাসপাতালের কর্মীরা বুঝে উঠতে পারছিল না এরা সবাই কেন এমন করছেন। পরদিন বিকেলে পুলিশ রাসায়নিক পরীক্ষা করে জানালো, স্যুপে পিসিপি বা মাদকের উপস্থিতি পেয়েছে তারা। পিসিপি বেশ বিপজ্জনক মাদকদ্রব্য। এর অতিরিক্ত সেবনে মানুষ মারাও যেতে পারে। সেদিন ভাগ্য ভালো বলতে হবে, টাইটানিকের শুটিং দলের অস্বাভাবিক আচরণ বা পাগলামি করা ছাড়া তাদের কপালে বড় ধরনের খারাপ কিছু ঘটেনি। কিন্তু স্যুপে মাদক মিশিয়েছিল কে? পুলিশ এর পরেরদিন ক্যাটারিংয়ের সব কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। শেষে কোনো সন্দেহভাজন না পাওয়ায় মামলা ওখানেই চাপা পড়ে যায়।
তবে জেমস একজনকে সন্দেহ করেছিলেন, তিনি তারই টিমের একজন ক্রু। যদিও জেমস পুরো নিশ্চিত নন, তাই সরাসরি তার নামও বলেননি। কিন্তু ঘটনার আগের দিন এই ক্রুকে তিনি বের করে দিয়েছিলেন। কারণ ক্যাটারিং কোম্পানির সঙ্গে তার ঝামেলা চলছিল। জেমসের সন্দেহ, প্রতিশোধ নিতেই ওই ক্রু এ কাজটি করে থাকতে পারে। আর তাতে সে সফলও হয়েছিল বলতেই হবে। এ ঘটনার পরও জেমস কিন্তু শুটিং চালিয়ে যান। তার পরের ইতিহাস তো সবারই জানা।
