অদ্ভুত শহর ইউবারি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:১৩

কথায় আছে—‘ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।’ ঠিক তার বিপরীত—‘একটু একটু করে কমতে কমতে পুরোটাই নেই হয়ে যায়।’ আজ আপনাদের এমন একটি শহরের সন্ধান দেবো যেখানে একটা একটা করে মানুষ হারাতে হারাতে গত ৫০ বছরে শহরটির ৯০ শতাংশ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই ‘নেই’ হয়ে গেছে! আর এই শহরটির সন্ধান দিচ্ছেন তাহমিদ আহমেদ শুভ্র

ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য, লও এ নগর

‘ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য, লও এ নগর।’—কথাটি আমাদের কাছে হয়তো কেবলই কথার কথা! কিন্তু ইউবারি নামের জাপানের একটি শহরে ঠিক যেন এই ঘটনাই ঘটছে। ইউবারি শহরটি জাপানের সবচেয়ে উত্তরের দ্বীপ হোক্কাইডুতে অবস্থিত। শিল্পোন্নত বিশ্বের খুব কম শিল্প শহরের সঙ্গেই তুলনা চলে ইউবারির। এই শিল্প শহরটির কয়লাখনি, কারখানা, বাণিজ্যিক দালানকোঠা আর বসতবাড়ির বেশিরভাগই পরিত্যক্ত। আগে থেকেই প্রকৃতি ঘেরা এই শহরকে যেন আবারো দখলে নিয়ে নিতে খুবই সক্রিয় প্রকৃতি। পরিত্যক্ত দালানকোঠা, মাঠ-ঘাট গাছ-গাছালির অবাধ বেড়ে ওঠার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোটখাটো বন্যপ্রাণীও ফিরে আসছে এখানে। জনমানবহীন রেলস্টেশন তো বটেই, শহরের পথ-ঘাটেই দেখা মিলবে বুনো হরিণের। এ যেন অরণ্যের শহর!

 

জাপানের মাঝে আরেকটি জাপান!

ইউবারি শহরকে পুরো জাপানের একটা ছোট্ট সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে! কোন হিসেবে জানেন? জন্ম ও মৃত্যুহারসহ জনসংখ্যার নানা পরিসংখ্যানের দিক বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে শহরটি যেন জাপানের মধ্যে ছোট্ট আরেকটি জাপান! এই শহরের শেষ হাসপাতালটিকে ছোট করে এনে একটা ক্লিনিকে পরিণত করার সময় খ্যাতনামা চিকিত্সক তোমোহিকো মুরাকামিও ঠিক এমনটাই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি তার মন্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘২০৫০ সালের জাপানের একটা মাইক্রোজম এখনকার ইউবারি।’ পরিসংখ্যান বলছে, ২০৬০ সালের জাপানে প্রতি ১০ জনে ৪ জন নাগরিকের বয়স হবে ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি।

 

শহরটি শুধু বয়স্কদের!

শিরোনাম শুনে মনে হতে পারে এই শহরে শুধু বয়স্করাই বসবাস করতে পারেন, শিশুদের বাস করার কোনো অনুমতি নেই। কিন্তু যা ভাবছেন ঠিক তা নয়। তাহলে? এই রহস্য খুঁজে বের করতে আমাদের যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়টাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই জাপানের উত্তরের দ্বীপ হোক্কাইডুতে গড়ে ওঠে এই শহরটি। কয়েকবছরের মধ্যে দালানকোঠা আর কয়লা শ্রমিকদের দখলে চলে যায় ইউবারি। এক সময় নামই হয়ে যায় কয়লার রাজধানী। ১৯৬০ সালের দিকেও এ শহরের জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। কিন্তু কয়লার শেষ খনিটাও বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৯০ সালে জনসংখ্যা নেমে আসে ২১ হাজারে। পরবর্তী দুই দশকে যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে। কয়লার শেষ খনিটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখানকার তরুণ-তরুণীরা কাজের খোঁজে চলে যায় জাপানের অন্যান্য শহর ও দেশের বাইরে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ইউবারিতে একটি শিশু জন্ম নিতে অন্তত ১ ডজন মানুষ মারা যায়। শহরের প্রতি ২০ জনে মাত্র ১ জনের বয়স এখন ১৫ বছরের নিচে। ২০১০ সালে এই শহরের বাসিন্দাদের গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। ২০২০ সালের মধ্যে এই গড় চলে যাবে ৬৫ বছরে। আর তখন ৪০ বছরের চেয়ে কমবয়সীদের তুলনায় ৮০ বছর বয়সীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবেন এখানে। এভাবে ইউবারি তখন বিশ্বের একমাত্র পেনশনভোগী সংখ্যাগরিষ্ঠ শহরে পরিণত হতে পারে!

 

এক শহর, এক স্কুল!

এই বাসিন্দাদের বেশিরভাগই বুড়ো-বুড়ি। শিশু তেমন নেই বলে বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল! জাপানের আর সব শহরের মতোই ইউবারিতেও এক সময় অনেক স্কুল-কলেজ ছিল। কিন্তু শহরে গুটিকয়েক শিশু ছাড়া আর কোনো স্কুল পড়ুয়া না থাকায় একে একে বন্ধ হয়ে যায় শহরের সব স্কুল। তবে এখন মাত্র একটি স্কুলেই চলছে শিশু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, এটা আর ক’দিন টিকে থাকে! এই স্কুলটি বন্ধ হলে এটা হবে বিশ্বের স্কুলহীন একটি শহর।

 

সূত্র:ডেইলি মেইল ও গার্ডিয়ান