রম্য গল্প

গৃহবন্দীর জবানবন্দী

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:১৪

/ আশরাফুল ইসলাম

 

বিদেশ থেকে সবেমাত্র এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছেন মোখলেস। এয়ারপোর্টে কর্তব্যরত পুলিশ মোখলেসকে বললেন, আপনাকে চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। চলুন আপনার জন্য ঘর বরাদ্দ করা হয়েছে।

মোখলেস বিদ্রোহের স্বরে আবৃত্তি করে ওঠলেন—

‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে

কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’

পুলিশ, শুধু নজরুলের কথা শুনলে হবে না, আপনাকে রবীন্দ্রনাথের কথাও মানতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘নীল নবঘনে, ভাইরাস সংক্রমণে, তিল ঠাঁই আর নাই রে।

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাইরে।’

রবীন্দ্রনাথের কথা মেনে নিয়ে মোখলেস কোয়ারেন্টাইনে থাকতে রাজি হলেন। ঘরে প্রবেশমাত্রই টেলিভিশন সাংবাদিক মলয় সাহা পর্দার আড়াল থেকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, কোয়ারোন্টাইনে থাকতে পেরে আপনার অনুভূতি কী?

মোখলেস রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠলেন, অনুভূতির গুষ্ঠী মারি। খুব খিদে পেয়েছে। ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো।

মলয় সাহা, আপনার জবানবন্দী নেয় শেষ হলেই আপনাকে ভাত দেয়া হবে। তার আগে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি কোন কোন দেশে ছিলেন?

মোখলেস, হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে। অনেক ঘুরেছি আমি বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে— সেখানে ছিলাম আমি আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে।

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

অনেক খিদে পেয়েছে আমার, এখন দুটো ভাত খেতে দেন। 

মলয় সাহা, জ্বি জ্বি আপনাকে ভাত দেওয়া হবে। তার আগে বলেন আপনি অনেক দেশ ঘুরে এসেছেন। আপনার শরীরে ভাইরাস থাকতেই পারে। আপনার মুখে মাস্ক নাই কেন? বিদেশফেরত ব্যক্তির মাস্ক পরা তো আইন।

মোখলেস, ‘আমি মানি নাকো কোনো আইন,

আমি ভরা তরী করি ভরা ডুবি,

আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন।’

ঠিক এই সময় ঘরের বাইরে অনেক লোকের আওয়াজ শোনা গেলো। টিভি সাংবাদিক তড়িঘড়ি করে সাক্ষাত্কার শেষ করে বাইরে বেরিয়ে দেখলেন প্রচুর জনতা ঘরের সামনে ভীড় করেছে। তারা কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে এক নজর দেখতে চায়।

তিনি যখন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন— কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে দেখার অনুমতি নাই। আপনারা ফিরে যান। তখন সবাই একত্রে বলে ওঠলেন—

‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্ত জমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী।’

এটা বলেই তারা টিভি সাংবাদিকের দিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে এলো। টিভি সাংবাদিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির জবানবন্দী অসমাপ্ত রেখেই প্রাণের ভয়ে দৌড়ে পালাল।  g