ভাইরাস এবং একটি রাতের গল্প

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:১৯

/ আশরাফুল ইসলাম

 

আমার চারপাশে নীল রঙের ধোঁয়া। যতদূর চোখ যায় শুধু নীল ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার ভেতর আমি বসে আছি। বসে আছি বলা ভুল হবে, বলা যেতে পারে ভাসছি। কারণ কোনো মাটির স্পর্শ আমি পাচ্ছি না। পুরো শরীরটা শূন্যের ওপর। আমি অনুমান করার চেষ্টা করছি এটা পৃথিবী নাকি অন্য কোথাও। এখানে তো অভিকর্ষ বল কাজ করছে না। তাহলে কি আমি ইহলীলা সাঙ্গ করেছি?

গতকাল খুব শ্বাসকষ্ট, সর্দি এবং জ্বর নিয়ে ঘুমিয়েছি। আজকাল ‘করোনা’ নামের এক বদমায়েশ ভাইরাসপৃথিবীকে আক্রমণ করেছে। সবাই সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে। আমিও কি সেই ভাইরাসের কবলে পড়েই মারা গেছি?

এমন সময় অট্টহাসি শুনতে পেলাম। বাংলা সিনেমার ভিলেন হুমায়ূন ফরীদি যেমন অট্টহাসি দেয়, খানিকটা সেরকম। তারপর দেখতে পেলাম গোলাকার কিছু একটা আমার দিকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে। তার গায়ে ক্যাকটাসের মতো কাটা। যত কাছে আসছে আকৃতিতে ততই বড় হচ্ছে। জিনিসটাকে আমার চেনা মনে হলো। কোথায় যেন দেখেছি। ঠিক মনে করতে পারছি না। হঠাত্ মনে হলো এই সেই বদমায়েশ ভাইরাস। করোনা।

আমার সামনে এসে সেই অট্টহাসি দিয়ে বলল, হে মানব সন্তান, করোনার সম্রাজ্যে স্বাগতম। আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে বললাম, মহামান্য করোনা, আপনার খেদমতে আমি কী করতে পারি?

—মানব সমাজে আমাদের নিয়ে ভুল ধারণা বিদ্যমান। সেই ধারণা ভাঙার জন্য মিডিয়ায় সঠিক তথ্য ছড়াতে হবে। আপনি সাংবাদিক মানুষ। পেপার পত্রিকায় ছেপে দেবেন আমার সাক্ষাত্কার।

আমি করজোড়ে বললাম, মহামান্য করোনা, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার নাম মামুন মারুফ না, আমি ইতালিতেও থাকি না। বাংলাদেশ নামে একটা গরিব দেশে থাকি। দিন আনি দিন খাই। আমি সাংবাদিক না। পত্রিকায় মাঝে মধ্যে ফালতু লেখা লিখি। আমাকে মাফ করেন জাঁহাপনা। আপনি বরং মামুন মারুফকে সাক্ষাত্কার দেন। তাহলে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে আপনার বক্তব্য পৌঁছে যাবে ফেসবুক, ইউটিউবে। আরো নানান জায়গায়।

করোনা ভাইরাস রাগান্বিত স্বরে বলল, ওরে মূর্খ মানব, করোনা কাউকে মাফ করে না। তোকেও মাফ করা হবে না। এতক্ষণ তোকে সম্মান দিয়ে কথা বলছিলাম। এখন আপনি থেকে তুই তে নামলাম। শুনে রাখ মানব সন্তান, তোকে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু সহজে পার পাবি না। আমি এখন খক খক করে কাশবো। সেই কাশি তোর কানে বাজতে থাকবে যতদিন তুই বাঁচবি। তোর জীবন হবে অসহনীয়। একথা বলেই বিকট শব্দে খকখক করে কাশলেন করোনা ভাইরাস।

প্রবল আতঙ্কে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। পানির পিপাসা হচ্ছে। এমন সময় শুনতে পেলাম কে যেন খকখক করে কাশছে। আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেলো।

এই ফ্ল্যাটবাড়িতে আমি একা। আর সবাই বাড়িতে চলে গেছে লকডাউন শুরু হওয়ার আগেই। এই রাত তিনটার সময় আমার ঘরে কে কাশে?

আমি আবারও শুনতে পেলাম—কাশির শব্দ। খকখক।

ভয়ে ভয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। ঘরে একটা মৃদু আলো। সেই আলোর উত্স কোথায় আমি টের পাচ্ছি না।

হঠাত্ আমার চোখ গেলো টেবিলের ওপর। তারপর আমার সব ভয়ভীতি দূর হয়ে গেলো।

টেবিলে রাখা ল্যাপটপ থেকে আলো আসছে। ঘুমানোর আগে ল্যাপটপে নাটক চালিয়ে দেখছিলাম। নাটক দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছি। কাশির শব্দ আসছে ল্যাপটপ থেকেই।

কি যেন একটা নাটক চলছে। সেই নাটকে খকখক করে কাশছেন এটিএম শামসুজ্জামান।    g