উহ করোনা, আহ করোনা!

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:১৯

/ জামসেদুর রহমান সজীব

 

সারাদিন শুয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই দিলখোশ সাহেবের। কোথাও কোনো মানুষ নেই। বিকেল হলে বাসার বারান্দায় ছোট ছেলের সাথে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে মানুষ খোঁজেন। কাউকে এক নজর দেখতে পেলে বাপে-ছেলে সজোরে চিল্লাতে শুরু করে। সেদিন রাস্তায় এক টহল পুলিশকে পেয়ে একইরকম চিত্কার চেঁচামেচি। পুলিশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই মিয়া। চিল্লান ক্যান?’ বত্রিশটা দাঁত বের করে দিলখোশ সাহেব জবাব দেন, ‘খুশিতে ভাই। অনেকদিন বাইরের কাউরে দেহি না। আপনে ভালো আছেন তো? বাড়ির সবাই ভালো? ভাত খাইছেন?’ কথা শুনে টহল পুলিশের মেজাজ খারাপ হয়। কিছু না বলেই হাঁটা দেয়। আর এদিকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত হূদয় নিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়েই থাকে দিলখোশ সাহেব। ভাবতে থাকেন, মানুষের ভেতরকার ভাতৃত্ববোধ প্রায় শেষের দিকে।

তিন-চারদিন পরপর খুব সকালে কাঁচা বাজারের জন্য বেরুতে পারেন দিলখোশ সাহেব। বাসা থেকে বেরুনোর আগে সে কী প্রস্তুতি! যেন যুদ্ধে যাচ্ছেন। পরিবারের সবার সাথে একবার করে কথা বলতে হয়। ঠাডা পড়া গরমের সময় চলছে, তারপরও কাপড়-চোপড়ের উপর রেইনকোট, মুখে মাস্ক, পায়ে মোজার সাথে বুটের জোতা, হাতে দস্তানা পড়ে রেডি হন। করোনা ভাইরাসের উপর ভরসা নাই। কখন কোন চিপাচুপা দিয়ে শরীরের ভেতর প্রবেশ করে সেই ভয়ে এই এলাহি আয়োজন। বাসা থেকে বেরুনোর পরও যখন পিছনে ফিরে চাওয়া যায়, বাপ-মা, বউ-বাচ্চা অশ্রুকাতর চোখে তাকিয়ে থাকে। দিলখোশ সাহেব আরও আতঙ্কগ্রস্থ হন, সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুনয় বিননয় করেন— হে খোদা, অল্পকিছু তরিতরকারি কিনে সহি সালামতে বাসায় ফেরার তৌফিক দান করো।

বাজার করে বাসায় ফিরতে ৪০ মিনিটও লাগে না। এর মাঝে কত প্রিয়-পরিচিত মানুষের সাথে সাক্ষাত হয়। কিন্তু কাছে যাবার সুযোগ নাই। কোলাকুলি তো বহু দূরের বিষয়, হ্যান্ডশেকের কথাও চিন্তা করা যায় না। নিজের আপন ছোট ভাইকে কাঁচা বাজারে দেখে খুশিমনে এগিয়ে গিয়েছিলেন দিলখোশ সাহেব, তার ছোটভাই খেয়াল করে এক দৌড়ে বাজার থেকে নাই হয়ে গেছে। কষ্টে দিলখোশ সাহেবের কান্না পেয়ে যায়। করোনা ভাইরাসের চৌদ্দগুষ্টিকে ভর্ত্সনা করতে থাকেন। কি এক ভয়ংকর সময়, নিজের আপন ভাই পর্যন্ত কাছ ঘেষতে ডরায়!

দেশের এই চরম মুহূর্তে মানুষজন যখন মৃত্যুভয়ে কম্পিত, তখন কিছু লোকজনদের কান্ড দেখে রীতিমতো ভড়কে যান দিলখোশ সাহেব। এই যেমন ছুুি লোক আছে মাস্ক খুলে হাঁচি কাশি দেবে, থু থু ফেলবে রাস্তায়, পান খেয়ে পানের পিক ফেলবে, তারপর আবার দিব্যি মাস্ক পড়ে নেবে! দিলখোশ সাহেব বুঝে উঠতে পারেন না তারা কি আসলেই মানুষ, নাকি বঙ্গবাজার থেকে মানুষের নকল চেহারা বানিয়ে সারাদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে!

বিষণ্ন-ভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরেও শান্তি নেই। সবাই এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন বাসায় মৃত্যুদূত এসেছে। বাজার সদাইসহ দিলখোশ সাহেবকে স্যাভলন মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল করতে হয়। তারপর এই স্যানিটাইজার সেই স্যানিটাইজার পা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত মাখার পর রুমে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়। দিলখোশ সাহেব নিজের রুমে চলে যান, ঠাশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েন। চোখ বুঁজে গভীর চিন্তায় তলিয়ে যান। একসময় ভাবতে থাকেন, চোখ তখনই খুলবেন যখন করোনার কোন অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে না। এমন সময় তার মোবাইল বেজে ওঠে, রিংটোনে বাজতে থাকে অতি সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি গান— ‘উহ করোনা, আহ করোনা, মোদের ছুঁয়ো না, মোদের ছুঁয়ো না...’! রিংটোনের আকামটা ছোট ছেলের, হতাশ হন দিলখোশ সাহেব। চোখ খুলবেন কি খুলবেন না সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বড্ড জ্বালা হয়েছে এই জীবনের!   g