করোনার উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় লক্ষ্মীপুর, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, নাটোর, নীলফামারী, মতলব উত্তর ও ঝিনাইদহে আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই বছর তিন মাস বয়সি এক শিশু রয়েছে। এদিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে মৃত নারীর নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় স্বজনরা লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেছে। খবর আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
লক্ষ্মীপুর ঃ করোনার উপসর্গ নি?য়ে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে দুইবছর তিন মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে ছেলে শিশুটি বাড়িতেই মারা যায়। এ ঘটনায় উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের তোরাবগঞ্জ গ্রামে নিহতের বাড়িসহ ৩টি বাড়ি লকডাউন করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কমলনগর উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এর আগেও তার শ্বাসকষ্ট ছিল। গত দুইদিন আগে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, রাতে খিচুনি ও শ্বাস কষ্ট হয়ে শিশুটি মারা যায়। শিশুটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
শরীয়তপুর ঃ জ্বর ও মাথা ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়ার এক ঘণ্টার মাথায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ২৫ বছর বয়সি ঐ নারীর মৃত্যু হয়েছে। ঐ নারী করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কি না তা পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় তার স্বজনরা লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। এ খবর পেয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের ঐ নারীর গ্রামের বাড়িতে চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠান নমুনা সংগ্রহ করার জন্য। পরে বাড়িতেই তার মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আর ঐ নারীর পরিবার ও আশপাশের কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মৃত ঐ নারী শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের শহীদুল মাদবরের স্ত্রী নিপা বেগম।
খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) ঃ নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের বড়হাটি গ্রামে সর্দি-জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিপেন্দ্র দাস (৫৫) নামে এক জন খেটে খাওয়া মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মারা যাবার পর খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সকরা এসে করোনা সন্দেহে ঐ ব্যক্তির মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। বড়হাটি গ্রামের নিপেন্দ্র দাসের প্রতিবেশী দীনেশ সরকার জানান, দীর্ঘ দিন ঢাকায় থাকার পর হালকা সর্দি জ্বর নিয়ে প্রায় দুসপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়িতে আসেন নিপেন্দ্র। এর পর থেকে ধীরে ধীরে জ্বর বাড়ে এবং শ্বাসকষ্টও হয় তার। শনিবার ভোরে তিনি মারা যান। তিনি আরো জানান, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে অন্য কেউ না আসায় শুধু মৃত ব্যক্তির পরিবারের ৫ জন মরদেহ স্থানীয় শ্মশানে দাহ করেন। খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচ এম আরিফুল ইসলাম বলেন, মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। আজ এ পরীক্ষার রিপোর্ট আসবে। তাতে করোনা ধরা পড়লে ঐ এলাকা লকডাউন করা হবে। আপাতত তার পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে।
নাটোর ঃ নাটোরে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কি না পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নাটোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, কাফুরিয়া গ্রামের এক ব্যক্তি (৫৫) জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা নিচ্ছিলেন। এ অবস্থায় গত রাতে তার মৃত্যু হয়। তার নমুনা পরীক্ষার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে পাঠানো হবে। পরীক্ষার পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৈয়দপুর (নীলফামারী)ঃ জুমার নামাজ আদায় করে এসেই ছটফট করছিলেন তিনি। এ অবস্থায় স্বজনেরা তাকে শুক্রবার নীলফামারীর সৈয়দপুরে ১০০ শয্যা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসেন; কিন্তু এর আগেই মৃত্যু হয় রেজাউল করিম (৩৬) নামের ঐ যুবকের। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালের আরএমও আরিফুল হক সোহেল জানান, শহরের নয়াটোলা মহল্লার ব্যবসায়ী রেজাউল করিমকে তার স্বজনেরা বিকালে হাসপাতালে নিয়ে আসেন; কিন্তু এর আগেই মৃত্যু হয় ঐ ব্যক্তির। এ অবস্থায় মরদেহ ফিরিয়ে নিয়ে যায় পরিবারের লোকজন। তার স্বজনেরা জানায়, কদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। তাই আমরা ঐ মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহের জন্য ওপরে বলেছি।
মৃত ব্যক্তির বড়োভাই মঈনুল আহসান বলেন, রেজাউল ঘর থেকে বের হতো না। তবে শুক্রবার নয়াটোলা মসজিদে সে জুমার নামাজ আদায় করতে যায়। ফিরে এসে সে ছটফট করছিল। আমাদের ধারণা সে হার্টঅ্যাটাকে মারা গেছে। ইউএনও মো. নাসিম আহমেদ জানান, সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে । তারা একটি সনদ তৈরি করছে। আসলে এটা করোনা ভাইরাস পজিটিভ না। কাজেই নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন নেই।
মতলব উত্তর (চাঁদপুর) ঃ মতলব উত্তর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি গ্রামে করোনার উপসর্গ (জ্বর, ঠান্ডা, বমি) নিয়ে এক বৃদ্ধা (৫৫) মারা গেছেন। শুক্রবার গভীর রাতে তিনি মারা যান। এ ঘটনার পর শনিবার সকাল থেকে মহিলার বাড়িসহ আশপাশের পাঁচটি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিকালে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন করা হয়েছে। মারা যাওয়া নারীর নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ঐ মহিলা মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন ছিলেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। তিনি গত দুই দিন আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে মতলব উত্তরে আসেন।
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি ঃ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর শহরে এনামুল হক নামে এক বৃদ্ধ সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। করোনা সন্দেহে তার দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চারটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, মৃত ব্যক্তি শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন। বয়স ৭০ বছরের বেশি। কিছুদিন আগে ফরিদপুরে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যান। সেখান থেকে বাড়ি ফিরে সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। খবর পেয়ে শুক্রবার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা তার বাড়িতে যান। শনিবার সকালে তিনি মারা যান। কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকর্মকর্তা ডাক্তার আবদুর রশিদ জনান, মৃত ব্যক্তির বাড়িসহ চার বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।
বগুড়া থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, বগুড়া শহরের পুরান বগুড়া এলাকায় শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে তার মৃত্যু হয়। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঐ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ সেখানে গিয়ে বাড়ির চারদিকে অবস্থান নেয়। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য সেখানে একটি টিম পাঠানোর কথা থাকলেও শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে কেউ যায়নি।
