অর্থবছরের আট মাস
ইত্তেফাক রিপোর্ট
কৃষিঋণ বিতরণে আগ্রহী হয়ে উঠছে প্রায় সব ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ের হার দিন দিন বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরেই মোট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে আদায়ের হার বৃদ্ধির ফলে কমে আসছে খেলাপির পরিমাণও। এদিকে সাম্প্রতি সময়ের করোনা পরিস্থিতি অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ব্যাংকগুলো ১৫ হাজার ৯২ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে। যা অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬৩ শতাংশ। বিতরণ হওয়া কৃষিঋণের ৫১ শতাংশই গেছে শস্য উত্পাদন খাতে। বাকি অংশ গেছে প্রাণিজ, মত্স্য, মসলা ও অন্যান্য খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি অর্থবছরে ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ১০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১৩ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা বিতরণ করবে। এ পর্যন্ত বিতরণ হওয়া ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। আর দেশি-বিদেশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৭ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা।
এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, অর্থবছরের এখনো বাকি আছে। এই সময়ে সবগুলো ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। গত অর্থবছরেও তা হয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি ব্যাংক ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করবে। অর্থবছরের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক তা ব্যাপক ব্যবধানে অর্জন করবে। কৃষি খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন পেলে তা পালন করা হবে বলেও তিনি জানান। এছাড়া করোনা পরিস্থিতির কারণে কৃষি ঋণের বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কোনো বিষয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রস্তুত আছে বলেও জানান তিনি।
কৃষি ঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায়ও বেড়েছে। গত জানুয়ারি শেষে ২ হাজার ২৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। বর্তমানে কৃষিঋণে খেলাপির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
তপশিলি ব্যাংকের বাইরেও বিভিন্ন সমবায়, এনজিও এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষি বিতরণ করা হয়। এসব মাধ্যমে ৭৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যা মোট খেলাপির মাত্র ২ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে নতুন নীতিমালায় বেশকিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এ মধ্যে রয়েছে এমএফআই নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব শাখা এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষি ঋণ প্রদান। কাজু বাদাম ও রামবুটান চাষ, কচুরিপানার ডাবল বেড পদ্ধতিতে আলু চাষ, ছাগল, ভেড়া, গাভী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, বাণিজ্যিকভাবে রেশম উত্পাদনে ঋণ প্রদান করা যাবে। বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ফসল উত্পাদনে ৪ হাজার ৪৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা; সেচ ও সেচের যন্ত্র ক্রয়ে ৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা; কৃষি খামারে ১ হাজার ২৫১ কোটি ২৭ লাখ টাকা; শস্য সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে ৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা; দারিদ্র্য দূরীকরণে কর্মোদ্যোগে ৬৮৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং কৃষি সম্পর্কিত অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২ শতাংশ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করার কথা। পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র দূরীকরণে বিভিন্ন প্রকার কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণও কৃষিঋণের আওতাভুক্ত। তথ্য অনুযায়ী অন্যান্য ঋণের পাশাপাশি অনুপাতিক হারে কৃষি ঋণ বিতরণ করা বাধ্যতামূলক। যে সব ব্যাংকের পল্লী অঞ্চলে শাখা নেই সেসব বাণিজ্যিক ব্যাংককেও এনজিও লিংকেজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে কৃষিঋণ বিতরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুদ হার নির্ধারিত আছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অ্যাথোরিটি (এমআরএ) নির্ধারিত ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে নির্ধারণে যে সুদ হার সেই হার। সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের এই এ কার্যক্রম শুরু করে।
