করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাইতে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকিতে উত্সাহিত করা হইতেছে। জরুরি প্রয়োজন না হইলে সবাইকে ঘরে থাকিবার পরামর্শ দেওয়া হইতেছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এলাকা লকডাউন করিয়া দেওয়া হইতেছে। সোশ্যাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলিবার নির্দেশ দেওয়া হইতেছে। অথচ ইহারই মধ্যে সিলেটের ভোলাগঞ্জে চলিতেছে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের মচ্ছব। সেখানে সকাল হইতে গভীর রাত্রি পর্যন্ত লিস্টার মেশিন দিয়া পাথর উত্তোলন করা হইতেছে। এইখানে সারা বত্সরই এই প্রকার অবৈধ কর্মকাণ্ড চলিয়া থাকে। কিন্তু এই দুর্যোগের সময়ও দুই হাজার শ্রমিক নিয়া পাথর উত্তোলনের কাজটি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তাহা বুঝিতে কাহারও অসুবিধা হইবার কথা নহে। যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সকল শিল্প-কলকারখানা বন্ধ, সেখানে এই সময় এমন একটি শ্রমঘন কাজ সিলেটে কীভাবে চলিতে পারে? ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর এলাকা, ধলাই ব্রিজের নিচ ও হাজির দাইন্যা লালপাথর এলাকা হইতে এই পাথর উত্তোলন করা হইতেছে।
আমরা জানি সিলেট একটি পাথরসমৃদ্ধ এলাকা। ইহার সীমান্ত জনপদ কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলায় রহিয়াছে পাথরের সাতটি কোয়ারি। মাটির নিচে থাকা এই সম্পদ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন করিতে গিয়া ধ্বংস করা হইতেছে পরিবেশ-প্রতিবেশ, আবাদি জমি ও জনবসতি। অনেক সময় বোমা মেশিন দিয়া মাটির নিচ হইতে পাথর উত্তোলন করিতে দুর্ঘটনাও ঘটিয়া থাকে। গত তিন বত্সরে সিলেটের সাত কোয়ারিতে এইভাবে পাথর উত্তোলন করিতে গিয়া প্রাণ হারাইয়াছেন ৭৬ শ্রমিক। জানা যায়, চলতি বত্সরের শুরুতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে সিলেটের সব কয়টি কোয়ারি হইতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হইয়া যায়। শ্রমিকদের পাঠাইয়া দেওয়া হয় নিজ নিজ এলাকায় এবং তাহাদের বিকল্প পেশা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রহিয়াছে যে, করোনা ভাইরাসের কারণে প্রশাসন জনসচেতনতা সৃষ্টি ও এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে ব্যস্ত হইয়া পড়ায় এই সুযোগে অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীরা আবার বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। বলা হইতেছে, পুলিশকে ম্যানেজ করিয়া প্রকাশ্যে এইভাবে শত শত শ্রমিক নিয়া পাথর উত্তোলন করা হইতেছে। এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন।
ভোলাগঞ্জ বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ কোয়ারি। আমরা পাথর উত্তোলনের বিরোধিতা করি না। কেননা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পাথরের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। তবে পাথর বা বালু উত্তোলনের কাজটি পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উপায়েই সম্পাদন করা উচিত। এখন বৈধ বা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা এই জন্য প্রয়োজন, যাহাতে শ্রমিকদের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা না থাকে। সারা বিশ্ব এখন এই ব্যাপারে সতর্ক ও উদ্বিগ্ন। সেখানে একেকটি গর্তে শত শত শ্রমিক কীভাবে কাজ করিতে পারেন? দ্রুত অভিযান চালাইয়া সিলেটে পাথর উত্তোলন বন্ধ করিয়া দেওয়ার জন্য আমরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। সেই সঙ্গে এই আপদকালে শ্রমিকদের যথাসম্ভব আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানাই।
