যুক্তরাজ্যে চিকিত্সাসেবা দিচ্ছেন ময়লা ফেলার ব্যাগ মাথায় দিয়ে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:৩৮

যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের পরিবেশ ও সরঞ্জামের শোচনীয় অবস্থা উঠে এসেছে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের একজন চিকিত্সকের বক্তব্যে। করোনা ভাইরাসের কারণে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, যাদের অবস্থা সংকটময় তাদের জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে হাসপাতালগুলো।

মূলত নিবিড় পরিচর্যা সেবা বা আইসিইউ বাড়াতেই এই উদ্যোগ। কিন্তু তাদের অভিযোগ যথাযথ সাপোর্ট বা সরঞ্জাম তারা পাচ্ছেন না। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তারা যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন তা হলো সরঞ্জামের অভাব। তাদের গণমাধ্যমে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের একজন কর্মরত চিকিত্সক বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে।

ড. রবার্টস (ছদ্মনাম), খাদের কিনারায় থাকা একটি হাসপাতালের কথা বলছেন। এই হাসপাতালের আইসিইউ এখন কোভিড-১৯ রোগীতে পরিপূর্ণ। এই হাসপাতালে কর্মীর অভাব আছে, সংকটময় রোগীর জন্য বিছানার অভাব আছে, একদম সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ও ভেন্টিলেটরের অভাব আছে। ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাজ্যে করোনা ভাইরাস ১৪ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বড়ো আঘাত হানবে, বিশ্লেষকদের ভাষায়  যেটাকে বলা হচ্ছে ‘পিক টাইম’। কর্মীরা এখনই অনুভব করছে কী পরিমাণ সংকটময় সময় আসছে সামনে।

চূড়ান্তভাবে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন এমন ডাক্তাররা এখন ১৩ ঘণ্টা করে কাজ করছে প্রতিদিন। ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে পিপিই—ব্যক্তিগত সুরক্ষা দেওয়া সরঞ্জামের অভাব প্রকট, এমনও হয়েছে যে পিপিইর অভাবে ময়লা ফেলার পলিথিন, প্লাস্টিকের অ্যাপ্রোন ও স্কিইং করার চশমা পরে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন তারা। যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা  ছাড়াই করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারেন এমন ব্যক্তির থেকে ২০ সেন্টিমিটারের মতো দূরত্বে থেকে কাজ করছেন ডাক্তাররা, যেখানে সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে দুই মিটার হতে হবে ন্যূনতম দূরত্ব।

রবার্টস বলছেন, যে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে তাদের জীবনে সেটা এখনই ভাবাচ্ছে, তারা এখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং নিজেদের পিপিই নিজেরাই তৈরি করছেন।

রবাটর্স বলেন, এটা বাস্তব চিন্তা, নিবিড় চিকিত্সা যেসব নার্স দিচ্ছেন তাদের এটা এখনই প্রয়োজন। তারা যেখানে কাজ করছেন সেখানে ভাইরাস অ্যারোসলের মতো করে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে খুব সাধারণ টুপি পরতে যেটায় ছিদ্র আছে।  যেটা কোনো সুরক্ষাই দিচ্ছে না। এটা প্রচণ্ড রকমের ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কর্মীরা বিনের ব্যাগ ও অ্যাপ্রোন পরে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।

যুক্তরাজ্যের সরকার সরঞ্জাম বিতরণ নিয়ে যে ঝামেলা হচ্ছে সেটা স্বীকার করেছেন। এখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। তবে সেখানে মাথার সুরক্ষা ও গাউনের কথা বলা হয়নি। রবার্টস যেখানে কাজ করছেন সেই হাসপাতালে কোনো সরকারি সামগ্রী পৌঁছায়নি বলছেন তিনি।

তিনি বলেন, এখন আমরা যে মাস্ক দিয়ে কাজ করছি সেটা নতুন করে তারিখ বসানো হয়েছে। আমি তিনটি স্টিকার দেখেছি যেখানে লেখা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ ২০০৯, ২০১৩ ও একটিতে ২০২১।

ইংল্যান্ডের পাবলিক হেলথ বলছে যেগুলোতে মেয়াদের তারিখ শেষ হয়ে গেছে সেগুলো তারা পরীক্ষা করে দেখে যে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু বিবিসি যে চিকিত্সকের সঙ্গে কথা বলেছে তিনি বলছেন তিনি এ বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এই মুহূর্তে রবার্টসের তিন জন সহকর্মী ভেন্টিলেশনে আছেন, যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের একজন কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করতেন। বাকি দুজন কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করতেন না, তাই তাদের পিপিই ছিল না। রবার্টস মনে করছেন এই দুজনেরও কর্মক্ষেত্রেই সংক্রমণ হয়েছে। চিকিত্সক রবার্টস সবচেয়ে কঠিন যে পরিস্থিতির কথা বলেন, পরিবারগুলোকে আমাদের বলতে হচ্ছে যে, আপনার রোগী মারা যাচ্ছে, তারা দেখতেও আসতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘এমনি সময়ে তো কেউ না কেউ পাশে থাকে, যাকে আমরা সান্ত্বনা দিই যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। স্পেনের স্বাস্থ্যকর্মীরাও ময়লা ফেলার পলিথিন পরে চিকিত্সা দিচ্ছেন। আমরা সেরা  ভেন্টিলেটর-সেবা দিতে পারছি না। আমরা নার্সিং কেয়ার সর্বোচ্চ দিতে পারছি না, আমাদের সেরা নার্সদের এত কাজ করানো হচ্ছে যে সেটা অমানবিক। আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক শেষের পথে আমি তাদের সব সেবার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।