করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় ৭২৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:৪৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বলেছেন, ‘কেউ কষ্ট করুক, সেটা আমি চাই না। সকলের কষ্ট লাঘব করাটাই আমাদের দায়িত্ব। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই প্যাকেজটা ঘোষণা দিয়েছি। এর শুভফলটা সকলে পাবেন। এই প্রণোদনা প্যাকেজ আমাদের মানুষের আর্থসামাজিক গতিশীলতা অব্যাহত রাখবে। ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজসমূহ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে আমাদের অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং আমরা কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’

গতকাল রবিবার গণভবনে বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও উত্তরণের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করার লক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, সম্ভাব্য বৈশ্বিক ও বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রপ্তানি খাতের পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের প্রতিও আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে।

এক্ষেত্রে সবাইকে দেশীয় পণ্যের উত্পাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আমি এইটুকুই চাই, সবাই যেন সততার সঙ্গে কাজ করেন। এই সুযোগ নিয়ে কেউ কোনো রকমের দুর্নীতি বা কোনো অনিয়ম না করেন। কেউ অপব্যবহার করবেন না। আমরা যদি সঠিকভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে কোনো সেকশনের মানুষের কেউ-ই, যারাই যে ব্যবসা করেন, তারা কোনো অসুবিধায়         পড়বেন না। সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা আজকের এই আয়োজনটা করছি।’

প্রধানমন্ত্রী যে চারটি খাতে প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন, এর মধ্যে রয়েছে—শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল। এসব খাতের প্রতিষ্ঠাগুলোকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ তহবিল করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ দেবে। এই ঋণে সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে অর্ধেক, অর্থাত্ সাড়ে চার শতাংশ পরিশোধ করবে ঋণগ্রহীতা শিল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাকি সাড়ে চার শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

দ্বিতীয় খাত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প এবং মাঝারি শিল্পে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ দেবে। এক্ষেত্রেও সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ শতাংশ পরিশোধ করবে ঋণগ্রহীত শিল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাকি ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

তৃতীয় খাত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) সুবিধা বৃদ্ধি। এ ক্ষেত্রে ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানির সুবিধা বাড়াতে ইডিএফের বর্তমান আকার ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। এর ফলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হবে। ইডিএফের বর্তমান সুদের হার লাইবর + ১ দশমিক ৫ শতাংশ (যা প্রকৃতপক্ষে ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ) থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। সর্বশেষ চতুর্থ খাতটি হচ্ছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম। এই নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল চালু করবে, যেখান থেকে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর আগে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠাগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি আপত্কালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলাম। নতুন চারটিসহ মোট পাঁচটি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।’ এসব আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে দেশে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব থেকে উত্তরণে তার সরকারের চার দফা কার্যক্রম দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন, যার মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘কর্মসৃজনকে’ মূলত প্রাধান্য দেওয়া হবে। বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসী ব্যয় নিরুত্সাহিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঋণের স্থিতি-জিডিপির অনুপাত অত্যন্ত কম (৩৪ শতাংশ) বিধায় অধিকতর সরকারি ব্যয় সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না। দ্বিতীয়ত, আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে কতিপয় ঋণ সুবিধা প্রবর্তন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখাই হলো আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য। তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণ, দিনমজুর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমসমূহ হলো—বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয়, লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ, ‘বয়স্ক ভাতা’ এবং ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের জন্য ভাতা’ কর্মসূচি সর্বাধিক দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় শতভাগে উন্নীত করা এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গৃহীত অন্যতম কার্যক্রম গৃহহীন মানুষদের জন্য গৃহনির্মাণ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি। চতুর্থত, মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রাক্কলন করেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে। দীর্ঘ ছুটি বা কার্যত লকডাউনের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের উত্পাদন বন্ধ এবং পরিবহন সেবা ব্যাহত হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস এবং সরবরাহ চেইনে সমস্যা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হবে। এর ফলে অর্থবছর শেষে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সামষ্টিক চলকগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে এটিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ যাবত্ ২০২টি দেশ ও অঞ্চলে এর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। বিশ্বে এখন প্রতিদিন ৭০ হাজারের বেশি মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে সময় মতো ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আল্লাহর রহমতে এখনো আমাদের এখানে ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেনি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ সময় প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় তার সরকারের পদক্ষেপসমূহের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশব্যাপী ছুটি ঘোষণা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশে লকডাউন অথবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। জনসাধারণকে ঘরে থাকার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ঘরে বসেই বাংলা নববর্ষ নিজের মতো উদ্যাপন এবং শবে বরাতে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া কামনার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগামী ১৪ এপ্রিল আমাদের বাংলা নববর্ষ শুরু। এ নববর্ষে সবাই ঘরে বসে নিজের মতো করে উদ্যাপন করুন। নববর্ষ ঘিরে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা যা কিছু তা মিডিয়ার মাধ্যমেই হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।