আবদুল মান্নান
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যখন একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে কোভিড-১৯ নামে একটি ভাইরাস মৃত্যুদূত হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের প্রাণ নিচ্ছে, তখন আমার বাংলাদেশ কেমন আছে ? এক কথায় তেমন একটা ভালো নেই। সবাই জানেন বাংলাদেশেও এই ভাইরাস আঘাত হেনেছে এবং ইতিমধ্যে দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সোমবার সকাল পর্যন্ত দশ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, সামনের দিনগুলো হয়তো আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি বলি আমার এই আশঙ্কার পেছনে কী যুক্তি আছে, তাহলে বলতেই হয় সাধারণ জনগণের অজ্ঞতা, মূর্খতা, লোভ ও একশ্রেণির ধর্ম ব্যবসায়ী মানুষকে নিয়মিত বিভ্রান্ত করার অবিরাম প্রচেষ্টা। সরকারের ভেতরে সমন্বয়হীনতা তো আছেই, তার ওপরে আছে কিছু মানুষের ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে খারাপ থেকে অধিক খারাপ হতে দেওয়া। শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দেশে কোভিড-১৯ আঘাত হানলে সরকার ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ছুটি ও লকডাউন ঘোষণা করে। অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ ঘোষণা করার আহ্বান জানায়। সরকার তারাসহ অন্যান্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করে। তার পরও কিছু কারখানা খোলা থেকে যায়। পরিস্থিতি উন্নত না হলে সরকার এই ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। কিন্তু যে সব কারখানা ৪ তারিখ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই সব কারখানার ছুটি বৃদ্ধি না করাতে কয়েক লাখ শ্রমিক ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। একই অবস্থা চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জেও। অনেককে মাছের ড্রামে করেও আসতে দেখা যায়। সে এক ভয়াবহ চিত্র, যা পোশাক কারখানার মালিক বা তাদের নেতারা বুঝতে অক্ষম। এই দৃশ্য বিশ্ব মিডিয়াতেও প্রচারিত হয়েছে যা আমাদের তৈরি পোশাক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তারা শুধু এই গরিব শ্রমিকদেরই কষ্ট দেয়নি, পুরো ঢাকা ও অন্যান্য শহরের সংলগ্ন এলাকায় কোভিড-১৯ ভাইরাস ছড়ানোর উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে ঢাকাসহ দেশের এই সব এলাকায় একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অনেকের প্রশ্ন, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানার (নিটসহ) মালিকরা এমন একটি আত্মঘাতী কাজ কেন করলেন? উত্তর দুটি। প্রথমটি হচ্ছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যতসব অর্জন তা ম্লান করে দেওয়ার জন্য যারা দিনরাত চেষ্টায় আছেন এরা তাদের অংশ বিশেষ। সবাই না হলেও অনেকেই আছেন। আরেকটি কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশের সীমাহীন লোভ এবং শ্রমিকদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে। কিন্তু এর মানে এই নয়, এই শিল্পের মালিকরা যখন তখন তাদের শিল্পের জন্য সরকারের কাছে প্রণোদনা চাইবেন, ব্যাংক হতে অর্থ নিয়ে তা ফেরত দেবেন না। দেশে আরো বেশ কিছু শিল্প আছে যেমন ওষুধ, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি। তারা তো সব সময় সরকারের মুখাপেক্ষী হয় না। এমনকি ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, লাওস প্রভৃতি দেশেও না। প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য, যার উল্লেখযোগ্য অংশ যেত এই পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বেতন ভাতা খাতে। সরকার এ-ও ঘোষণা করেছিল এই অর্থ শ্রমিকরা সরাসরি পাবেন, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অথবা বিকাশের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে। এটি মালিকদের পছন্দ হয়নি। তারা এই অর্থ সরাসরি তাদের দেওয়ার দাবি তুলেন নানা অজুহাতে। শুরুতে তারা ধরে নিয়েছিলেন এই অর্থ তাদের দেওয়া হবে এককালীন খয়রাতি সাহায্য হিসেবে। ফেরত দিতে হবে না। সরকার বলল ফেরত তো দিতেই হবে সঙ্গে দিতে হবে দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ। মালিকদের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তে সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তারা সরকারকে এক হাত তো নিতে চাইতেই পারেন। আর বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি তো একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি। আর এই বন্ধ খোলা বিষয়ে শিল্প-বাণিজ্য-স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জানা গেল তাদের মধ্যে এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এই সময়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মাঝে সমন্বয়ের কত বড়ো অভাব—এটি তার বড়ো প্রমাণ।
মিছিলের মতো লাখ লাখ শ্রমিক যখন পুরো সংসার নিয়ে এক দেড়শত মাইল পায়ে হেঁটে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করে, যখন তারা রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরসহ তত্সংলগ্ন এলাকাগুলোকে এক ভয়ংকর বিপদের মুখে ঠেলে দিল। যেই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়াসহ চারদিকে এই অপরিণামদর্শী কাজের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল, তখন এই কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ ঘোষণা দিল যে তাদের ছুটি ১১ তারিখ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তখন বাজে রাত সাড়ে ১০টা। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সব শ্রমিক ইতিমধ্যে ঢাকা প্রবেশ করেছেন, তারা কি আবার নিজ বাড়িতে সেই একই কায়দায় ফেরত যাবেন ? এমন আহম্মকি চিন্তা কেউ করতে পারে তা আগে জানা ছিল না।
ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি ধর্মভীরু কিন্তু কখনো ধর্মান্ধ ছিল না। তাদের এই সরলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অর্ধশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী তাদের নিয়মিত বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম শেখ আহমদ আল-তায়েবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কাউন্সিলের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত দ্বিতীয় সভা হয়। এর আগেও তারা একই ফতোয়া জারি করেন। তারা বলেন, ইসলামি আইনের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো, মানুষের জীবন বাঁচানো এবং যাবতীয় বিপদ থেকে সবাইকে রক্ষা করা। একই সিদ্ধান্ত হয় সৌদি সরকারের বয়ঃজেষ্ঠ্য ইসলামি চিন্তাবিদদের কাউন্সিলের সভায়। তারা সহি-আল বোখারির হাদিস নম্বর ৫৭৩৯ ও আল মুসলিমের হাদিস নম্বর ২২১৯ উদ্ধৃতি করে বলেন, ‘এই দুই হাদিসে বর্ণিত আছে হজরত মুহাম্মাদ (দ.) বলেন, ‘যদি তোমরা শোনো (কোনো প্লেগ বা মহামারি) একটি স্থানে সংক্রমিত হয়েছে, তাহলে তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে না, আর তুমি যে স্থানে অবস্থান করো তা যদি ওই স্থানে হয়, তা হলে তুমি ওই স্থান ত্যাগ করবে না। মসজিদে আজান হবে কিন্তু প্রচলিত জামাত হবে না। শুধু মসজিদের ইমাম আর মুয়াজ্জিন নামাজ আদায় করবেন।’
গত দুই জুমা পবিত্র মক্কার হেরেম শরিফে ও মসজিদে নববিতে কোনো জুমার জামাত হয়নি। গত বুধবার হতে তো এই মক্কা ও মদিনা শহরে কারফিউ জারি ছিল। নাইজেরিয়া পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম মুসলিম দেশ। সেখানে এখন কারফিউ চলছে। রাস্তায় দেখা গেলে সেনাবাহিনী গুলি করছে। পাকিস্তানে গত শুক্রবার সরকার জুমার নামাজ মসজিদে না পড়ার জন্য অনুশাসন জারি করে। বেশির ভাগ মসজিদ তা মেনে চলে। নিয়মিত যেই বড়ো জামাতগুলো হয়, তা আপাতত বন্ধ এমনি কি দিল্লির শাহি জামে মসজিদসহ। একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। যেখানে শুধু অর্ধশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ীরা সরল প্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্তই করে না, এমন কি গত শুক্রবার চট্টগ্রামের একটি সড়কে দেখা গেল এমন কিছু জোব্বা আর পাগড়িদারি মানুষ হ্যান্ড মাইক লাগিয়ে বলছেন ইসলামে নাকি সংক্রামক রোগ বলতে কিছু নেই। শুধু একশ্রেণির মুসলমান ধর্ম ব্যবসায়ীরা বিভ্রান্ত করছে না অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রামনবমী গেল কয়দিন আগে। ভারতে এই উপলক্ষ্যে বের হওয়া মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে লেগে যায় দাঙ্গাহাঙ্গামা। দক্ষিণ কোরিয়ায় কোভিড-১৯ যে মহামারি ছড়িয়েছে তার সূত্রপাত তো একটি গির্জায়। ইতিমধ্যে এই বছর পবিত্র হজ্ব পালিত হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তা নিয়েও আমাদের দেশের অনেকেই জেনে হোক বা না জেনে হোক নানা মত দিচ্ছেন। তারা কি জানেন আগে একাধিকবার পবিত্র হজ বাতিল করা হয়েছিল? প্রথম বাতির হয়েছিল ৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে, সর্বশেষ ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে প্লেগ ও কলেরার কারণে তিনবারে মোট সাত বছর হজ বন্ধ ছিল। (তথ্যসূত্র: হারাম শরিফের ওয়েবসাইট, মিডল ইস্ট আইটিআরটি, দি নিউ আরব)।
বাংলাদেশে নাকি এখন লকডাউন চলছে। কোনো একটি হাটবাজারে গেলে তা কি মনে হয় ? মনে হবে ঈদের আনন্দ চলছে। কাজ নেই কাম নেই তাই বলে আড্ডা তো বন্ধ থাকতে পারে না। আমার আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হলে আমার চেয়ে খুশি কেউ হবে না। বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো এই সময় শেখ হাসিনার মতো একজন প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তিনি ক্লান্তিহীনভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। কিন্তু কথা হচ্ছে তার সঙ্গে টিমের অন্য যে সদস্যরা আছেন, তারা কি একই পথে হাঁটছেন ? সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে তা তো মনে হয় না। এই মুহূর্তে আমার দেশ ভালো নেই। তবে প্রার্থনা করি যেন চলমান ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হতে ভালো হয়ে উঠুক। সবাই ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন।
n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক
