বিধি মেনে করোনা ঠেকাই, উত্পাদন বাড়াই

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৪

এ এইচ এম নোমান

-এর ১২ নভেম্বর যে ঝড়-তুফান বন্যা উপকূলীয় এলাকায় হলো তা ছিল ভয়াল। এরপর কয়েক মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ভয়াবহ এ মুক্তিযুদ্ধকালে শুধু যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তা নয়, এলাকায় ছিল রাজাকার, আলবদর। এর পরও দুর্ভিক্ষ, মন্দা, জলোচ্ছ্বাস, মঙ্গা, রাজনৈতিক হানাহানি কম যায়নি। এসব বাধা আমরা উতরিয়েছি। বর্তমানে করোনা ভাইরাস-১৯-এর ভয়াবহ আক্রমণ আমাদের দিকে ধেয়ে এসে গেছে। এর ভয়াবহতা অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার ভাষণে অনেকগুলো ঘোষণা দিয়েছেন, যা সময়োপযোগী। আমাদের সেগুলো মানতে হবে। পাশাপাশি অন্য পথ ও পন্থা এবং বিকল্প হিসেবে আমরা কী করতে পারি, এটাও তিনি নিশ্চয় খুঁজছেন। আমরা আক্রান্ত হচ্ছি কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, পতাকা এনেছি এবং একটি ভূখণ্ডও পেয়েছি। সংগ্রাম, যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে আমরা অভিজ্ঞ। প্রতিকূলতা কীভাবে সামাল দিতে হয়, সে অভিজ্ঞতা আমরা অতীতে রপ্ত করেছি। করোনার ফলে যে মন্দা, দুর্ভিক্ষ সামনে আসতে পারে তা শ্রমিক, চাষি, খেত-খামারি, নিম্ন আয়দেরই বেশি ভোগান্তি হবে।

যে ভয়াবহতা সামনে আসবে, সে বিষয়ে আমাদের বিকল্প চিন্তা এখন থেকেই করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে তার যত হাত (জনবল) আছে তাদের কাজে লাগাতে হবে। এ মন্ত্রণালয়ের বিশাল জনবল গ্রাম, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। তাদের ব্যবহার করে কৃষকদের বীজ, সার, টেকনোলজি, সেচ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। বিএডিসি এ বিষয়ে একটি বড়ো ভূমিকা পালন করতে পারে। ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় বীজ, সার, কীটনাশক, ওষুধ চলাচলের ছাড় দিয়েছে। করোনার বিধিনিষেধ ভয়াবহতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পুলিশ বাহিনী মাঠে নামছে, আর্মিও আছে কিন্তু তারা তো কৃষকদের পিটিয়ে সাবধান করলে হবে না। শ্রম ও উত্পাদনের এ বিপ্লব আমাদের ঘটাতেই হবে, তাহলে পৃথিবীব্যাপী মন্দা হলেও আমরা মোকাবিলা করতে পারব ও পরিত্রাণ পাব। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, কৃষিসহ যে খাতগুলো যেমন—মুরগি ডিম দিতে থাকবে, গরু দুধ দিতে থাকবে, মাছ বাড়তে থাকবে, খেতে ফসল হতে থাকবে—এগুলো কীভাবে বাজারজাত হবে, মূল্য পাবে, সংরক্ষণ হবে, মজুতদারি না হয় এসব দিকে সংশ্লিষ্ট নজরদারি রাখতে হবে। কর্মকর্তা, কর্মচারীরা এ পরিস্থিতিতে খামারিদের বাড়িতে যাবে, তদারক করবে; তবে অবশ্যই প্রটেকশন নিয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাক্তার নার্সদের মত পোশাক তাদেরও সরবরাহ করতে হবে। আমাদের উত্পাদন এমন এক স্থানে নিতে হবে যেন আমরা পৃথিবীর মধ্যে দৃষ্টান্ত দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পারি। দুর্যোগ মোকাবিলা করে উত্পাদন কীভাবে বাড়িয়ে আল্লাহর নেয়ামত কীভাবে আমরা সাজিয়ে ফসল ঘরে নিতে পারি, তাই আজ করার বিষয়। আমাদের গান আমাদেরই গাইতে হবে। আমাদের মাছ-মুরগি-গবাদিপশু (মামুগ), শাকসবজি, ফসল উত্পাদন এমনভাবে বাড়াতে হবে যেন আমরা রপ্তানি করতে পারি। আমরা যেন ভাবি মন্দায় আটকে না থেকে উঠে আসতে পারি। পশ্চিমারা যে ধরনের প্রোপাগান্ডা করতে পারে, প্রোটেকশন প্ল্যান নিতে পারে, আমরা তো তা নিতে পারি না। ওরা ধনী, ওদের টাকা আছে আমাদের টাকা নেই। ওরা বেকারদেরকে সাহায্য করছে, যারা দোকান পাট বন্ধ করছে তাদের টাকা দিচ্ছে। সবখানে তাদের ডিসিপ্লিন আছে, দুর্নীতি নাই, স্বচ্ছতা আছে। আমাদের কী আছে? আছে মনোবল, সাহস ও ধৈর্য। কাজের মাধ্যমে আমাদের কর্মজনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৮০-৯০ ভাগ কভার করতে পারি। আর এটা করলেই আমরা কিন্তু এগিয়ে গেলাম, জিতে গেলাম। এ যুদ্ধে অবশ্যই আমাদের কাজ ফ্রন্ট ফাইটিং করোনাকে পরাজিত করা আর ব্যাক ফাইটিং উত্পাদন বৃদ্ধিতে হাত দেওয়া।

সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিজাবলড ভাতা, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এসব ঝুঁকির মধ্যে থাকা নাগরিকদের গাইড করা, সাবধানতা অবলম্বন করা ও পরামর্শ দেওয়া। এতে তারা মানসিকভাবে উত্সাহিত হবেন এবং মনোবল পাবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় মাতৃত্বকালীন ভাতা ও ভিজিডি দিয়ে থাকে এবং তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনীজাল বিদ্যমান আছে। ৩০ লাখেরও বেশি মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মা তালিকাভুক্ত আছে, যাদের নিয়ে দীর্ঘ এক প্রজন্ম মেয়াদি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সমন্বিত স্বপ্ন প্যাকেজ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মায়েদের জানানো যে তাদের কী ধরনের প্রোটেকশন নিতে হবে, কীভাবে থাকতে হবে, কী ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, কেন তাদের হাত ধোয়াসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। অনেক এনজিও এখন মাঠে নামছে। তারা ঝুঁকি-সচেতনতা ও প্রোটেকশন বিষয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি তারা উত্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

’৭০-এর বন্যাপরবর্তী একটা উদাহরণ দিই : এখন বাজারে যেসব সবজি, যেমন—লেটুস, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাঁজর, ভুট্টা ইত্যাদি পাওয়া যায়, মানুষ কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ১৯৭০-৭২ সালে কেউ এগুলো চিনত না বা বাজারে পাওয়া যেত না। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের লক্ষ্যে সবজি-ভাত আন্দোলনের আওতায় তখন আমাদের বিভিন্ন সমবায় প্রদর্শনী খামারে কৃষকেরা এসব উত্পাদন করত। তবে তা বাজারে খুব একটা বিক্রি হতো না। কৃষকেরা অভিযোগ করত যে, ভাই এগুলো তো আপনারা চাষ করতে বললেন, এখন তো বিক্রি হয় না। তখন আমরা তৃতীয় একজনকে দিয়ে বাজার থেকে কিনে নিতাম, কৃষককে উত্সাহ দিতে। এখন অবশ্য সেদিন আর নাই, এগুলোর প্রচুর চাহিদা। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যেক এগিয়ে নেওয়ার জন্য কৃষকদরদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমরা অনুসারী। তার বক্তব্যে ‘অধিকার’ শব্দটি বারবার আসছে। শ্রমিক, কৃষক, পিছিয়ে ফেলাদের কথা বলার মতো কোনো মন্ত্রী/কর্মকর্তা আছেন যারা অধিকার নিয়ে কথা বলেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করি আপনি কৃষি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সজাগ করুন। চাষাবাদসহ উত্পাদনমুখী খাত চালু রেখে মাঠে কাজ আর উত্পাদনই বর্তমান প্রেক্ষাপটে একমাত্র লক্ষ্য—যা খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

n  লেখক : এনজিও প্রতিষ্ঠাতা