সাইফুল ইসলাম
মহামারির এ সময়ে আমরা নিরাপদে থাকতে বাসায় সময় কাটাচ্ছি। আমরা অনেকেই বাসায় থাকার এই সময়টাকে সুন্দরভাবে কাজে লাগিয়েছি। কেউ আবার পরিবার এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি, আবার কেউ কাটিয়েছি নানাভাবে মানুষের সহযোগিতা করে। শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, এ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনেকেই আবার এই সময়টাকে ব্যয় করেছি—অহেতুক দুশ্চিন্তা করে, ভয় পেয়ে, নেতিবাচক কথা বা ভাবের আদানপ্রদান করে। অথবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভার্চুয়াল জগতে কাটানোর মাধ্যমে নিজের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে নিজেকে আরো ভয় এবং আতঙ্কে ভাসিয়ে।
আসলে গুজবের যেমন হাত-পা নাই, তেমনি আতঙ্কেরও হাত-পা নাই। ভূতের অস্তিত্ব যেরকম কল্পনায়, তেমনি ভয়ের অস্তিত্বও বিস্তার করে কল্পনার জগতে। কল্পনা থেকে মনোরাজ্যে এবং মনোরাজ্য থেকে দেহে এসবের বিস্তার হয়। ভয় সব সময়ই দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, নষ্ট করে দেয়, দুর্বল করে দেয়।
ভয় যেরকম বিশ্লেষণের আলো সহ্য করতে পারে না; করোনা-আতঙ্কও এই বিশ্লেষণের আলোয় উধাও হয়ে যাবে। কারো কারো মনের অবস্থা এখন এরকম যে, ‘করোনা’ যেন ক্ষুধার্ত বাঘের মতো চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে—পাওয়া মাত্রই খেয়ে ফেলবে। এই ভয়কে জয় করতে আসুন বিশ্লেষণের আলো ফেলি বাস্তবতার ওপর।
বাস্তব সত্য হচ্ছে—করোনা ভাইরাসে যারা আক্রান্ত হন, তাদের ৮১ শতাংশই মাইল্ড বা সাধারণ অসুস্থ হন। যেটার জন্য হাসপাতালে যাওয়ারও কোনো প্রয়োজন হয় না! ১৪ শতাংশ অসুস্থ হন, যাদেরকে হাসপাতালে নিতে হয়। বাকি ৫ শতাংশ ক্রিটিকেল বা জটিল। ইনটেনসিভ কেয়ারে নিতে হয়। তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট লাগবে। এটা হচ্ছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১৮ মার্চের রিপোর্ট। তাহলে যে রোগের ৮১ শতাংশের জন্য হাসপাতালেও নেওয়ার প্রয়োজন হয় না; সেটাকে সর্দি-কাশি-জ্বর মানে ফ্লু বলা যায়!
বিশিষ্ট চিকিত্সকদের মতে, শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত যে শুদ্ধাচার, সেটা যদি আমরা অনুসরণ করি তাহলে সংকট আমাদেরকে তেমন কিছুই করতে পারবে না। যে কারণে আমাদের এখানে করোনার সুযোগ করতে পারার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। যদি আমরা একটু সচেতন হই এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। চিকিত্সকরা বলছেন, সরকার বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে, হাতটাকে ভালোভাবে ধোয়া এবং কারো হাঁচি-কাশি বা এই জাতীয় কোনোকিছু দেখলে তার থেকে দুই ফুট/তিন ফুট দূরত্ব মেইনটেইন করা। তার বডি-টাচের মধ্যে না যাওয়া। এটা একটা সুন্দর পদক্ষেপ।
বাস্তব তথ্য হলো—করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৩ জানুয়ারি থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে ৫৯ হাজার ১৬৫ জন। অর্থাত্ যদি আমরা গড় করি—৭২ দিনে গড়ে মৃত্যুর হার হচ্ছে প্রতিদিন ৮২১ জন। আর প্রত্যেক দিন সারা পৃথিবীতে মারা যাচ্ছেন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ। এর মধ্যে শুধু হূিপণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগে ও স্ট্রোকে মারা যান প্রতিদিন প্রায় ৪১ হাজার ৬৪৩ জন (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী)। প্রতিদিন বিশ্বে যে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় তার জন্য তেমন কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে না বা হূদেরাগে যে প্রতিদিন ৪১ হাজার মৃত্যু হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সাড়াশব্দ নেই; কিন্তু এই ৮০০ মৃত্যু আতঙ্ক সৃষ্টি করছে!
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবার উদ্যোগ নিতে হবে; কিন্তু যে কোনো রোগ থাকুক, খারাপ জিনিস থাকুক, অসুস্থতা থাকুক সেটার ব্যাপারে সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। বাসায় থেকে একজন সচেতন নাগরিকের উচিত্ যোগব্যয়াম, প্রার্থনা, ধ্যান বা মেডিটেশন, ভয়ের বদলে সেবার মনোভাব, ইতিবাচক চিন্তা, কথা ও কাজ, সব সময় আশাবাদী ও সাহসী থাকা, সুন্দর ঘুম, সুষম প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাস। সুস্থ থাকার জন্য এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খেতে হবে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। আমাদের গণমাধ্যম, চিকিত্সক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব নিয়মিতই বলছেন।
তাই যারা নিয়ম মানেন, যোগব্যায়াম, ধ্যান করেন তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম, যদি তারা স্বাস্থ্য-সুরক্ষাবিধি সুন্দরভাবে পালন করেন। এখন যেহেতু বাসায় পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেছে, এই সময়টাকে নিজের ইমিউন সিস্টেমটাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য কাজে লাগাতে হবে।
চেষ্টা করতে হবে সবাই যেন গুজব ও বাস্তবতা, আতঙ্ক ও সত্য, রটনা ও তথ্যের গভীরে ঢুকতে পারি। সত্যকে উপলব্ধি করে সবাই যেন সাহসী হয়ে উঠতে পারি। আমাদের যে জাতিগত সাহস এবং বীরত্বের পরিচয় আমরা যুগে যুগে দিয়েছি; সেই সাহস সমমর্মিতা এবং বীরত্ব নিয়েই আমরা জেগে উঠতে পারব বলে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস, আশাবাদ, সাহস ও সমমর্মিতা অটুট থাকুক, অব্যাহত থাকুক সবার মধ্যে। এই প্রত্যাশা ও শুভ কামনা করি।
n লেখক : সাংবাদিক
