প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে সর্বসাধারণকে ইবাদত বা উপাসনা নিজ নিজ বাড়িতে পালনের নির্দেশ দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা কমিটিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এই সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এ-সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় ধর্ম মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে যথাযথভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে ব্যাপক সংক্রমণ এবং বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনা ভাইরাস মানুষের হাঁচি, কাশি, নিঃশ্বাস ও সংস্পর্শের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে সংক্রমিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমিত ব্যক্তির দেহে রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই তার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটতে পারে। অনেকের মধ্যে ভাইরাসটি সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে, যার লক্ষণ দৃশ্যমান হয় না। আগে থেকে সতর্কতা অবলম্বন না করলে এর বিস্তার রোধ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ রকম হতে থাকলে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ব্যাপক সংক্রমণ ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, বিশ্বে এ পর্যন্ত এ রোগের কোনো প্রতিষেধক বা চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়নি। যে কারণে সরকার সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে এবং সামাজিক দূরত্ব বজার রাখার লক্ষ্যে দেশের সব নাগরিককে ঘরে থাকার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জনসমাগমের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার ঘটছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এ ধরনের বিস্তার ও প্রাণহানির ঘটনার উদাহরণ বিদ্যমান। ইতিমধ্যে মুসলিম স্কলারদের অভিমতের ভিত্তিতে পবিত্র মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারাসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের মসজিদে মুসল্লিদের আগমন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এ রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সর্বসাধারণের আগমন বন্ধ রাখার জোর পরামর্শ দিয়েছেন’—বলেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সবার সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিম্নোক্ত নির্দেশনা প্রদান করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়—১. মসজিদের ক্ষেত্রে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমগণ ব্যতীত অন্য সব মুসল্লিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিজ নিজ বাসস্থানে নামায় আদায় এবং জুমার জামাতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। ২. মসজিদে জামাত চালু রাখার প্রয়োজনে সম্মানিত খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম মিলে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজে অনধিক পাঁচ জন এবং জুমার জামাতে অনধিক ১০ জন শরিক হতে পারবেন। জনস্বার্থে বাইরের মুসল্লি মসজিদের ভেতরে জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ৩. অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদেরকেও উপাসনালয়ে সমবেত না হয়ে নিজ নিজ বাসস্থানে উপাসনা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। ৪. এ সময়ে সারাদেশে কোথাও ওয়াজ-মাহফিল, তাফসির মাহফিল, তাবলিগি তালিম বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা যাবে না। সবাই ব্যক্তিগতভাবে তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও বিপদ মুক্তির প্রার্থনা করবেন। ৫. অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এ সময়ে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হতে পারবেন না।
সরকারি নির্দেশ মেনে নামাজ
ঘরে পড়ুন: আল্লামা শফী
করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়ার যে নির্দেশনা ধর্ম মন্ত্রণালয় দিয়েছে, তা মানতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেম ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় গণমাধ্য?মে পাঠানো এক বিবৃ?তিতে তিনি এই আহ্বান জানান। কোরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করে আল্লামা শফী বলেন, ইসলাম নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়াকে সমর্থন করে না; বরং নিষেধ করে। সর্তকতা ও সচেতনতা ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে কোনো আশু ক্ষতি থেকে সতর্ক থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। আল্লামা শফী বলেন, বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আমাদের দেশও বেশ ঝুকিপূর্ণ এবং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক এ মহামারি ইতিমধ্যে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করছেন। এ মুহূর্তে আল্লাহর কাছে দোয়া এবং শরিয়তের আলোকে সতর্কতা অবলম্বন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সতর্কতার জন্য সরকার উলামায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে, যে কোনো ধরনের বড়ো জমায়েতকে নিষেধ করেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার আদেশ দিয়েছে। মসজিদে জামাত ও জুমার উপস্থিতিকে সীমিত রাখার আদেশ জারি করেছে। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব সতর্কতামূলক নির্দেশনা সঠিক ও যথার্থ। সরকার কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশনাকে মূল্যায়ন করা এবং তা উত্তম রূপে গ্রহণ ও পালন করা মানবতার কল্যাণে আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। তবে সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণই আমাদের একমাত্র কাজ নয়। বরং আমাদের কৃত পাপ ও সমূহ অন্যায় থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
