করোনার উপসর্গ নিয়ে আরো ১৩ জনের মৃত্যু

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২২:৫০

দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার উপসর্গ নিয়ে গতকাল সোমবার পর্যন্ত আরো ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন খান মৃত্যুবরণ করেছেন। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তির ২০ মিনিটের মধ্যে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

বরিশাল অফিস :গতকাল সোমবার বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে জ্বর, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে করোনা ইউনিটে ভর্তি হন ৫০ বছর বয়সি ইউসুফ আলী। ভর্তির ২০ মিনিটের মধ্যে সাড়ে ৫টায় করোনা ইউনিটেই তার মৃত্যু হয়। তিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার কাউনিয়া থানাধীন তালতলী এলাকার রাঢ়ী মহলের বাসিন্দা।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন জানান, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ঐ রোগীকে করোনা ইউনিটে ভর্তির কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান। কী কারণে তার মৃত্যু হয়ছে তা জানার জন্য পরীক্ষা করতে হবে। এজন্য তার নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হবে। বরিশাল জেলা প্রশাসক       এস এম অজিয়র রহমান জানান, বিষয়টি জানার পর ঐ বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। এ নিয়ে শেবাচিম হাসপাতালের করোনা ইউনিটে তিন জন রোগীর মৃত্যু হলো।  বর্তমানে করোনা ইউনিটে ৯ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে চার জন নারী ও পাঁচ জন পুরুষ।

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) :জাহাঙ্গীর হোসেন খান গতকাল সোমবার ভোরে উপজেলার নগদাশিমলা ইউনিয়নের বাদে মাকুল্লা গ্রামের নিজ বাড়িতে মারা যান। সন্ধ্যায় ইসলামী ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা মোতাবেক এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঐ গ্রামের বাসিন্দা মজিবর রহমান জানান, জাহাঙ্গীর হোসেন টাঙ্গাইল শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ বসবাস করতেন। করোনার কারণে আদালত বন্ধ থাকায় পরিজন নিয়ে গত ১৭ মার্চ গ্রামের বাড়িতে আসেন। কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন গ্রামে তিনি জনসংযোগ করে বেড়িয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলীম আল রাজী জানান, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তার পরিবারের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ বিশ্বাস জানান, করোনা উপসর্গের সন্দেহে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কাপাসিয়া (গাজীপুর) :গতকাল সকালে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক নারীর (৩৫) মৃত্যু হয়েছে। দুই সন্তানের জননী ঐ নারী উপজেলার তরগাঁও গ্রামের অধিবাসী। কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুস সালাম সরকার বলেন, ‘ঐ নারীর জ্বর ও সর্দি-কাশি ছিল না। তিনি প্রায় তিন বছর যাবত্ শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত চিকিত্সা নিচ্ছিলেন। তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আমাদের ডাক্তার পাঠিয়ে পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন না। ঐ নারী ও তার স্বামীসহ পরিবারের সদস্যদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছি এবং পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।’

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) :জ্বর ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়ে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে খবর পেয়ে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি মেডিক্যাল টিম মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে সিভিল সার্জনের কাছে পাঠিয়েছেন। মৃত রিকশাচালকের পরিবারকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং তাদের বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হবিগঞ্জ :চুনারুঘাট উপজেলার পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গতকাল সকালে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। ৭৩ বছর বয়সি এই বৃদ্ধ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন বলে পরিবারের দাবি। চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যজিত রায় দাশ বলেন, ‘উপজেলার শানখলা ইউনিয়নের এই আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ২৪২টি পরিবার বসবাস করে। সকালে একজন বৃদ্ধের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। তার পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, তিনি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন।’

গাইবান্ধা: সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট গ্রামে করোনার উপসর্গ নিয়ে গত রবিবার বিকালে আবদুল  রাজ্জাক (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রাতেই ঐ যুবকের বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। রাত ১১টায় গাইবান্ধা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জানান, আবদুর রাজ্জাক ঢাকার নারায়ণগঞ্জে রাজমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেখানে সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ মার্চ বাড়ি ফিরে আসেন। এ ছাড়া তার আগে থেকেই অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট রোগ ছিল। নমুনা পরীক্ষার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের সানচু মিয়া (৪৫) নামে এক টং দোকানদার গত শনিবার করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগ তার দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আইইসিডিআরে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে। গত রবিবার কুলাউড়া পৌরসদরের ৬ জনের উপসর্গ দেখা দিলে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঐ দিনই ঢাকায় পাঠায়। তাদের মধ্যে ১ জন ডাক্তার রয়েছেন ও ২ জন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী রয়েছেন।

ভাঙ্গা (ফরিদপুর): উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের রায়পাড়া গ্রামে সোমবার ভোরে করোনা উপসর্গ নিয়ে সালাম মাতুব্বর (৭০) নামের এক বৃদ্ধ মারা গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডাক্তার মহসিনউদ্দিন জানান, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট এবং লিভারে সমস্যা নিয়ে তিনি কয়েকদিন যাবত্ অসুস্থ ছিল। খবর পেয়ে তার শরীর থেকে স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাই। 

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) : করোনা ভাইরাস উপসর্গ নিয়ে শহিদুল ইসলাম (১৮) নামে এক পোশাক শ্রমিক মারা গেছেন। তিনি উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের সরাপপুর গ্রামের বাসিন্দা। ইউপি সদস্য ও সরাপপুর গ্রামের বাসিন্দা হায়দার আলী জানান, শহিদুল ইসলাম ঢাকা থেকে গত বুধবার হাঁচি-কাশি নিয়ে বাড়িতে আসে। এরপর তার জ্বর ও প্রচণ্ড গলাব্যথা শুরু হয়। একই সঙ্গে পাতলা পায়খানাও হতে থাকে। অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে সোমবার বেলা ১২টার দিকে তাকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে করোনা আতঙ্কে তাকে চিকিত্সা না দিয়ে বগুড়াস্থ শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিত্সক। বগুড়ায় যাওয়ার পথে বেলা ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর: ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। ঐ বৃদ্ধের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায়। চারদিন আগে তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার পর নিহত ঐ ব্যক্তির বাড়ির আশপাশের অন্তত ১০০ পরিবারকে কঠোরভাবে হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। করোনা পরীক্ষার জন্য তার নমুনা আইইডিসিআর এ পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মুসলিমপাড়া গ্রামে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরা এক মুদি ব্যবসায়ী সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ঐ ব্যক্তির ডায়াবেটিস ছিল। সুগার কমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর-এ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাংশা (রাজবাড়ী): পাংশায় করোনার উপসর্গ নিয়ে রুহুল শেখ (৩৫)  নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সেনগ্রাম এলাকার মৃত হবির শেখের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, গত সপ্তাহে রুহুল ঢাকা থেকে আসেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তিন-চারদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ঠাণ্ডা কাশিতে ভুগছিলেন। মৃত ব্যক্তির নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

সীতাকুন্ড (চট্টগ্রাম) :  সীতাকুন্ডে  আইসোলেশনে থাকা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল বেলা তিনটায় নগরীর জেনারেল হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আলিম উল্ল্যাহ (৭১) মারা যান। করোনার উপসর্গ সন্দেহে গত রবিবার রাতে হাসপাতালে আইসোলেশনে ভর্তি হন। তিনি করোনায় আক্রান্ত কি না তা জানতে ডাক্তাররা নমুনা সংগ্রহ করেছে।