আলোকপাত

করোনা ভাইরাস : জাপান কি ভুল পথে হাঁটছে

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২১:২২

আবদুল্লাহ-আল-মামুন

চীনের বাইরে প্রথম করোনা রোগী চিহ্নিত হয় জাপানে। সেটা ছিল জানুয়ারির ১৬ তারিখ। নানামুখী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কারণে চীনের পার্শ্ববর্তী দেশ হয়েও এপ্রিল মাসে দেশটিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের মতো। রবিবার পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৮৩। মনে রাখতে হবে জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক মানুষের দেশ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। টোকিওসহ ৮টি ফ্রিফেকচারে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পুরো দেশ লকডাউনে যাচ্ছে না। সরকার জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়ার উপদেশ দিয়ে জীবনযাপন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে গত এক সপ্তাহ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা এবং হার টোকিওতে সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ এমনকি বিভিন্ন প্রিফেকচারের (জেলা) গভর্নররা দেশে ইমারজেন্সি (লকডাউন) ঘোষণার কথা বলছে। অন্যদিকে শিনজো আবের সরকার মনে করছে—অবস্থা এখনো এমন হয়নি যে ইমারজেন্সি ঘোষণা করতে হবে। বরং সরকার যে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে তাতে লকডাউন না করেও করোনা আক্রান্তের গতি রোধ করা যাবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

প্রতিবেশী চীনে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নোভেল করোনা ভাইরাস রেসপন্স হেডকোয়ার্টার খোলা হয়। প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে সভাপতির দায়িত্বে আছেন। করোনা ভাইরাসবিষয়ক টাস্কফোর্স খোলা হয়েছে। স্থানীয় শাখা কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। জাপান করোনাবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর তিনটি মূল বিষয় হলো—(১) দ্রুত রোগী চিহ্নিত করা এবং ক্লাস্টার ব্যবস্থাপনা, (২) রোগীর সমস্যা নির্ধারণ এবং যথাযথ চিকিত্সার ব্যবস্থা করা, (৩) নাগরিকদের আচার-আচরণের পরিবর্তন। এই নীতিমালার আলোকেই জাপান করোনা মোকাবিলা করছে।

করোনা প্রতিরোধের জন্য জাপান সরকার মোটা দাগে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমত, রোগী চিহ্নিত করা এবং তার দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে এমন গুচ্ছ বা ক্লাস্টারকে বিচ্ছিন্ন করা। দ্বিতীয় যে কাজটি জাপান প্রথম থেকেই শক্ত হাতে করতে পেরেছে তা হলো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও বিমান বন্দরগুলোতে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা। হুবাই সংক্রমণের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে জল ও বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করেছে।

তৃতীয়ত যে কাজটি জাপান সফল করার চেষ্টা করছে তা হলো নাগরিকদের আচার-আচরণের পরিবর্তন অর্থাত্ করোনা প্রতিরোধসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালন করা। চতুর্থত, স্বাস্থ্যসেবাকে করোনা মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে জাপান সরকার ৬২ বিলিয়ন ইয়েনের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

সরকার লকডাউন ঘোষণা না করলেও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, বিপণিবিতান নিজেরাই বন্ধ ঘোষণা করছে। মানুষের চলাচল অনেকটাই কমে আসছে। ট্রেনের যাত্রীর সংখ্যা ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। জাপান সরকার বর্তমানে থ্রি-সির ওপর জোর দিচ্ছে ঃ ক্রাউডেড স্পেস উইথ পুওর ভেন্টিলেশন, ক্রাউডেড কন্ডিশনস উইথ পিপল অ্যান্ড কনজারভেশন ইন শর্ট ডিস্টেনস। মূলত, নাগরিকদের যতটা সম্ভব বাড়িতে থাকতে বলা হচ্ছে। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, জাপান তার এ পলিসির মাধ্যমে কতটা সফল হতে পারে। নাকি দেরি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুর্যোগ ডেকে আনে।

n লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং 

কলাম ও প্রবন্ধ লেখক।