এবার রাঙ্গামাটি জেলায় নির্বাচনী লড়াই হবে ত্রিমুখী। নির্বাচনের শুরু থেকে রাঙ্গামাটির হেভিওয়েট তিন প্রার্থী আওয়ামী লীগের দীপংকর, বিএনপির মনি স্বপন, জেএসএস সমর্থিত স্বতন্ত্র ঊষাতন তালুকদার। মূলত দ্বিমুখী লড়াইয়ের একদিকে আওয়ামী লীগের দীপংকর তালুকদার ও অন্যদিকে জেএসএস-এর স্বতন্ত্র প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচারণা আছে— এগিয়ে আছে দীপংকর, পেছনে ঊষাতন, সব শেষে মনি স্বপন। প্রচার-প্রচারণা ও পাহাড়ি-বাঙালি সকল পক্ষের জনসমর্থনের মাঝে এগিয়ে আছে দীপংকর তালুকদার। অপরদিকে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের সমর্থন ও দলীয় চাপের মাঝে পেছনে আছে ঊষাতন তালুকদার। বিএনপির মনি স্বপন আছেন বেকায়দায়, বিএনপির রাঙ্গামাটি জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার নেতাকর্মীরা দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগদান করায় দুর্বল হয়ে পড়ছে তারা। মূলত মাঠে লড়াই হবে দুই তালুকদারের মধ্যে।
জাতীয় দল হিসাবে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলেও বিএনপিতে দ্বিধাবিভক্তই বিএনপিকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। নির্বাচনের শুরু থেকে বিএনপি মাঠে থাকলেও গত তিন-চারদিনে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে অনেকটাই ভাটা পড়েছে। এদিকে গত ২৭ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রবীন্দ্র লাল চাকমাসহ প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করায় বিএনপির জনসমর্থন আরো নেমে গেছে।
বৃহত্তর এ জেলায় ১০ উপজেলা ও দুই পৌরসভা নিয়ে জনসংখ্যা ছয় লাখ ২০ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে ভোটার হচ্ছে চার লাখ ১৯ হাজার ২৪৮ জন। এবারে রাঙ্গামাটি জেলায় নতুন ভোটার হচ্ছে ৩৯ হাজার ৫৬৩ জন। পাহাড়ি এ জেলার মূল সমস্যা পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে খুনোখুনি ও রক্তপাত। নির্বাচন এলেই এসব সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়। শঙ্কায় দিন কাটে পাহাড়ে বসবাসরত নিরীহ মানুষের মাঝে। যদিও সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি সবাই শান্তির পক্ষে, সকলেই শান্তি চায়। স্থানীয়দের মতে, যে প্রার্থী অত্র এলাকার জনগণের পাশে থেকে পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন, সে প্রার্থীকেই যোগ্য হিসেবে বেছে নিবেন।
স্থানীয় শিক্ষক বিনয় বাবু জানান, আমরা দেশে শান্তি চাই, এলাকায় শান্তি চাই। আমরা চাই না এ অঞ্চলে আর কোনো লাশ পড়ুক। যে দল পাহাড়ে অরাজকতা বন্ধ করতে পারবে বলে মনে হয় সে দলকেই ভোট প্রদান করবো। তবে উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হুমকি ও তত্পরতার মুখে আগামী নির্বাচনে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে কিনা এটাই এই আসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনেরও।
রাঙ্গামাটি জেলার সচেতন ও অভিজ্ঞ মহল মনে করছে, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এবার মাঠে নেমেছে কোমর বেঁধে। দীপংকর তালুকদার ২০১৪ সালে পরাজয়ের পর থেকে মাঠে ছিলো বলেই এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফুরফুরে মেজাজে। দলীয় কোন্দল ও দ্বিধাবিভক্ত না থাকায় এবারের নির্বাচনে সকলে মাঠে নেমেছে নৌকার পালে হাওয়া লাগাতে।
অন্যদিকে, দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি মনোনয়ন নিয়ে জটিলতার কারণে বিএনপির নির্বাচনমুখী হলেও জনসমর্থন তেমন পাচ্ছে না। অপরদিকে আঞ্চলিক দল হিসাবে জনসংহতি সমিতির জনসমর্থন রয়েছে অনেক আগে থেকেই। এছাড়া পাহাড়ের কয়েকটি আঞ্চলিক দলের কারণে কিছুটা বেকাদায় রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। এই আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে ছিলো। পাঁচবারের নির্বাচনে তিনবারই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ’৯১-এ বিএনপি সরকার গঠন করলেও রাঙ্গামাটি আসনটি আওয়ামী লীগের হাতে চলে যায়। ’৯৬ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ধরে রাখে আসনটি। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির সমর্থনে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালে পূর্ণ জনসমর্থ নিয়ে বিপুল ভোটে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০১৪ সালে নির্বাচনে অনেকটা বিএনপির জনসমর্থন ও অবৈধ অস্ত্রের মুখে ৫৩টি কেন্দ্র দখল করে জেএসএস আওয়ামী লীগের জয় ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
