ফারহানা নওশিন তিতলী
অটিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ আউটোস থেকে। বিশেষ ধরনের স্নায়ুবিক সমস্যাই অটিজম। অটিজম শিশুদের বিকাশগত একটি সমস্যা। এ শিশুরা সাধারণত অপরের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, তারা অতিরিক্ত জেদী, নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও গুটিয়ে রাখার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। তারা নিজস্ব মনোজগতে বসবাস করে ফলে অনেক সময় এদের আচরণও হয় অস্বাভাবিক। অটিস্টিক শিশুরা বুদ্ধি বিকাশজনিত সমস্যার কারণে নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা নিতে পারে না। একটি পরিবারে অটিস্টিক শিশু জন্মগ্রহণ করলে সমাজের মানুষের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশু জন্মদান করার দায়ভার আসে মায়ের ওপর। কুসংস্কারপূর্ণ সমাজে মাকে দোষারোপ করা হয়। বাবা-মায়ের কাছে অটিস্টিক সন্তান অনেক আদরের হলেও আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই অটিজম শিশুকে একটি বোঝা হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার অনেক পরিবার অটিস্টিক সন্তানের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। এমনও লক্ষ্য করা যায় একটি পরিবারে তিনটি সন্তানের মধ্যে একটি সন্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশজনিত সমস্যা থাকলে সেই সন্তানকে নিয়ে তারা বাইরে আত্মীয়স্বজনদের মাঝে নিয়ে যেতে লজ্জা পান। এজন্য তিনটি সন্তানের মাঝে একটি সন্তানকে সব সময় গুটিয়ে রাখেন। বাবা-মায়ের এমন লুকোচুরির ফলে ঐ শিশুটি মানসিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে গবেষকরা মনে করেন, জেনেটিক, নন-জেনেটিক ও পরিবেশগত প্রভাব সমন্বিতভাবে অটিজমের জন্য দায়ী। পরিচর্যাই এর একমাত্র বিকল্প। এছাড়া অটিজমের জন্য আরো কিছু বিষয়কে সন্দেহ করা হয়, এগুলো হচ্ছে গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস, বাচ্চার অন্ত্রের পরিবর্তনগত সমস্যা, মার্কারির (পারদ) বিষক্রিয়া, বাচ্চার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ পরিপাক করতে না পারা, টিকার প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।
বাংলাদেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন অটিস্টিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম কর্তৃক দেশব্যাপী পরিচালিত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। অটিস্টিক শিশুদের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সাধারণ জ্ঞানের ঘাটতি থাকে। সাধারণ জ্ঞানীয় ঘাটতির বিপরীতে অটিস্টিক শিশুরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা থাকতে পারে, বিশেষ করে যোগাযোগ ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অসামর্থ্যতা। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা অস্বাভাবিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে, যেমন-চিত্রাঙ্কন, সংগীত, গাণিতিক সমস্যার সমাধান অথবা মুখস্তবিদ্যা।
আমাদের সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণা হচ্ছে অটিজম কখনো ভালো হয় না এবং এই রোগের কোনো চিকিত্সা নেই। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী চিকিত্সা আর সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব এই সমস্যাটিকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। অটিস্টিক শিশুর প্রথম চিকিত্সা হলো তার সমস্যাটি খুঁজে বের করা। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের জটিলতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কিছু জনপ্রিয় থেরাপি রয়েছে। এই থেরাপিগুলোর মাধ্যমে অনেক সময় অটিজম শিশুরা একেবারে সুস্থ হয়ে যায়। তবে অটিজমের চিকিত্সা সময়সাধ্য। আজকের অটিস্টিক শিশুরা যাতে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, এটা আমার, আপনার, গোটা জাতির। আমরা সবাই যদি সচেতন থাকি, তবেই অটিজম শিশুরা ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ দেখতে পারবে।
আমাদের দেশে অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু দেশে যে হারে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে অটিস্টিক শিশুদের স্কুলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে না। অটিস্টিক শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ স্কুল না থাকায় তারা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি এনজিওগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্যাটির সমাধান করা যেতে পারে। সঠিক পরিচর্যা, চিকিত্সা ও সচেতনতাই পারে অটিস্টিজ শিশুদেরকে বোঝা থেকে সম্পদে পরিণত করতে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
